একসময় আফ্রিকা পরিচিত ছিল দারিদ্র্য, সংঘাত ও সাহায্যনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে। আজ সেই আফ্রিকাই পরিণত হয়েছে বৈশ্বিক শক্তির নীরব প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে। অস্ত্রের ঝনঝনানি নয়, কূটনীতি, বিনিয়োগ, ঋণ ও করপোরেট চুক্তির আড়ালে শুরু হয়েছে এক নতুন ‘কোল্ড ওয়ার’—যার মূল পুরস্কার আফ্রিকার বিপুল খনিজ সম্পদ।
এই প্রতিযোগিতা শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি প্রযুক্তি, সামরিক শক্তি, জলবায়ু রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ বিশ্ব নেতৃত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
কেন আফ্রিকা এত গুরুত্বপূর্ণ?
আফ্রিকা পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ খনিজভাণ্ডারগুলোর একটি। লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল, ইউরেনিয়াম, তামা, ম্যাঙ্গানিজ ও বিরল খনিজ, এসবের বড় অংশই আফ্রিকার মাটির নিচে। আধুনিক বিশ্বে এই খনিজগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ-
বৈদ্যুতিক গাড়ি
নবায়নযোগ্য জ্বালানি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তি
সামরিক সরঞ্জাম ও মহাকাশ প্রযুক্তি
সবকিছুই নির্ভর করছে এই খনিজগুলোর ওপর। ফলে যে রাষ্ট্র এই সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণ করবে, ভবিষ্যৎ বিশ্ব ব্যবস্থায় তার প্রভাবও হবে নির্ধারক।
নতুন ‘কোল্ড ওয়ার’-এর খেলোয়াড়রা
এই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে রয়েছে চারটি শক্তি- চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও রাশিয়া।
চীন গত এক দশকে আফ্রিকায় অবকাঠামো, খনি ও বন্দর নির্মাণে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। রাস্তা, রেল, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিনিময়ে তারা দীর্ঘমেয়াদি খনিজ সরবরাহ নিশ্চিত করছে। এটি কোনো সামরিক দখল নয়, বরং অর্থনৈতিক উপস্থিতির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের কৌশল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ বিষয়টি অনেক দেরিতে বুঝতে পেরেছে। এখন তারা ‘স্বচ্ছ বিনিয়োগ’, ‘মানবাধিকার’ ও ‘টেকসই উন্নয়ন’-এর ভাষায় আফ্রিকায় নতুন করে সক্রিয় হচ্ছে। মূল লক্ষ্য—চীনের একচেটিয়া প্রভাব ঠেকানো এবং নিজেদের প্রযুক্তি শিল্পের জন্য নিরাপদ খনিজ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
রাশিয়া ভিন্ন পথে হাঁটছে। তারা সামরিক সহযোগিতা, নিরাপত্তা সহায়তা ও রাজনৈতিক সমর্থনের বিনিময়ে খনিজ চুক্তি করছে। কিছু দেশে নিরাপত্তা সংকটকে কাজে লাগিয়ে রাশিয়া নিজের অবস্থান শক্ত করছে।
আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলো: শিকার না খেলোয়াড়?
এই নতুন কোল্ড ওয়ারে আফ্রিকার দেশগুলো একদিকে সুযোগ পাচ্ছে, অন্যদিকে ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বহু সরকার এখন বুঝতে পারছে, এই খনিজ সম্পদ শুধু আয়ের উৎস নয়, বরং কূটনৈতিক দরকষাকষির শক্তিশালী হাতিয়ার।
তবে সমস্যা হলো, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অনেক ক্ষেত্রে এই সম্পদের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছাতে দিচ্ছে না। বরং কিছু দেশে ‘রিসোর্স কার্স’ বা সম্পদ অভিশাপ আরও গভীর হচ্ছে- খনিজ আছে, কিন্তু উন্নয়ন নেই।
পরিবেশ ও মানবাধিকার: উপেক্ষিত বাস্তবতা
এই প্রতিযোগিতার আরেকটি অন্ধকার দিক হলো পরিবেশ ও মানবাধিকার। খনি সম্প্রসারণে বন উজাড়, পানিদূষণ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি বাড়ছে। শিশু শ্রম, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং স্থানীয় সংঘাতের ঘটনাও কম নয়।
বৈশ্বিক শক্তিগুলো কূটনৈতিক ভাষায় টেকসই উন্নয়নের কথা বললেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের অগ্রাধিকার খনিজ সরবরাহ- মানবিক মূল্য পরে।
ভূরাজনীতি থেকে ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থা
আফ্রিকার খনিজ নিয়ে এই প্রতিযোগিতা আসলে ভবিষ্যৎ বিশ্ব ব্যবস্থার লড়াই। যে দেশ বা জোট আধুনিক প্রযুক্তির কাঁচামাল নিয়ন্ত্রণ করবে, সে-ই আগামী দশকগুলোতে বৈশ্বিক নেতৃত্বের কাছাকাছি থাকবে।
এই কারণেই আফ্রিকা আজ আর প্রান্তিক নয়; বরং ভূরাজনীতির কেন্দ্রস্থলে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
প্রশ্ন হলো- এই নতুন কোল্ড ওয়ারে আফ্রিকা কি আবারও কেবল শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর দাবার বোর্ডে পরিণত হবে, নাকি নিজের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সত্যিকারের উন্নয়নের পথে হাঁটবে?
এর উত্তর নির্ভর করবে আফ্রিকার নেতৃত্ব, আঞ্চলিক ঐক্য এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্বশীল আচরণের ওপর। অন্যথায়, খনিজের দৌড়ে বিশ্ব এগিয়ে গেলেও আফ্রিকার বহু জনগোষ্ঠী আবারও থেকে যাবে শোষণের ইতিহাসে বন্দী।