আন্তর্জাতিক

চলমান যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত, খুলবে হরমুজ, শিগগিরই আসবে ঘোষণা: ট্রাম্প

নিজস্ব প্রতিবেদক

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ বন্ধে একটি সমঝোতা চুক্তি 'প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে' পৌঁছেছে এবং শিগগিরই তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে বলে দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, পারস্য উপসাগরের কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে।

শনিবার (২৩ মে) প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, এই বিষয়ে তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন, যা 'খুব ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে'। তবে ইসরায়েলি সূত্রগুলো বলছে, সম্ভাব্য এই চুক্তি তাদের জন্য 'বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়' হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, ইরানে যৌথভাবে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এরপর থেকে আলোচনার টেবিলে রাখা হয়নি ইসরায়েলকে। অনেকটা, দর্শকের মতো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হয়েছে দেশটিকে। অনেকেই দাবি করেছেন, নেতানিয়াহু পাপেটের মতো মাস্টারের (ট্রাম্প) সবুজ সংকেত পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। 

অন্যদিকে, ট্রাম্পের ইউরোপীয় মিত্রদের ভাষ্য, এই যুদ্ধ শুরু করার পূর্বে, তাদের সাথে কোন ধরনের পরামর্শ করেননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এতে, ট্রাম্পের ওপর আস্থা কমেছে তাদের। 

ট্রাম্পের নিজ দেশেও জনপ্রিয়তা ক্রমশই কমছে। ডেমোক্র্যাটিক পার্টি, বিশেষকরে চাক শুমারসহ বেশ কয়েকজন ট্রাম্পের 'যুদ্ধ ক্ষমতা' কমাতে আপিল করেছেন। যদি বিরোধী দলের সমালোচনা সাইডে রাখাও হয়, তাহলেও নিজ দল রিপাবলিকান শিবিরে ট্রাম্পের পক্ষে সাফাই দিতে দিতে অনেকটা কোণঠাশা অবস্থায় নেতাকর্মীরা। 

যুদ্ধের প্রথমে ট্রাম্পকে মদদ দিচ্ছিলো অনেক ডিফেন্স কোম্পানি। বিশেষকরে, অস্ত্রবিক্রিসহ নানান বিষয়ে। ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা অভিযান সফল হওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের অন্ধ ভক্তরা মনে করেছিলেন ইরানে হামলা কিংবা সামরিক অভিযান 'ইজি' হবে। 

এছাড়াও যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার, সামরিক ঘাঁটি, নৌবাহিনীর জাহাজ ধ্বংস এবং শীর্ষ নেতাদের মেরে অনেকটা আত্মবিশ্বাসী ছিলেন ট্রাম্প-নেতানিয়াহু। তবে, তেহরান ঘুরে দাঁড়িয়ে বন্ধ করে দেয় হরমুজ প্রণালি। কারণ, তেহরান বুঝতে পেরেছে, সারা পৃথিবীর এক-পঞ্চমাংশ তেল এই হরমুজ দিয়ে যাতায়াত করে। ফলে, চতুর্দিক থেকে আচমকা চাপে পড়েন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

নিজের নির্বাচনী ইশতিহারে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি নতুন করে সংঘাত শুরু করতে আসেননি। বরং এক সপ্তাহের মধ্যে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধ করে দেবেন। এতোসব কথা বলে নিজেই বাধিয়ে দিলেন যুদ্ধ। মার্কিন সমর বিশ্লেষকরা বলেছেন, এই যুদ্ধে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ব্যবহার করেছেন গ্রেটার ইসরায়েল প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করার জন্য। 

তবে, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এমন দাবি নাকচ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেবে না। সেজন্যই হামলা করেছে। ইসরায়েলের কোন হাত নেই। যদিও, ট্রাম্পের ইউরোপীয় মিত্রদের ভাষ্য, ইরান থ্রেট হলে হামলার আগে তাদের জানানোর প্রয়োজনও মনে করেননি ট্রাম্প। 

সূত্র অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) প্রায় চূড়ান্ত। এতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা, আঞ্চলিক সংঘাত স্থগিত করা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় সম্পূর্ণভাবে বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এছাড়া ইরানের জব্দকৃত প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ মুক্ত করার কথাও আলোচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সরাসরি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। এ বিষয়টি পরবর্তী ধাপে আলোচনার জন্য রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে তেহরান।

এছাড়াও ট্রাম্প চাচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্য ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের অধীনে থাকা বিভিন্ন প্রক্সি গ্রুপকে মদদ দেওয়া যাতে বন্ধ করে ইরান। একইসাথে, প্রক্সি গ্রুপগুলোর আত্মসমর্পণ ও অস্ত্র জমা দেওয়ার মতো আবদারও রয়েছে।   

ইরানের প্রতিক্রিয়া

ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে এবং ট্রাম্পের বক্তব্য 'অসম্পূর্ণ ও সামঞ্জস্যহীন'।

অন্যদিকে ইরানের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি ও আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে একটি প্রাথমিক সমঝোতা কাঠামো নিয়ে অগ্রগতি হয়েছে, তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

এমন অবস্থায়, ইরানের দাবিদাওয়া মেনে নেওয়া ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে অন্য কোনো পথ নেই বলে দাবি করেছে তেহরান। 

শনিবার (২৩ মে) দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রেজা তালাই-নিক বলেন, ইরানের দাবি অস্বীকার করলে তা ট্রাম্পের জন্য আরও ব্যর্থতা ডেকে আনবে।

তিনি দাবি করেন, যুদ্ধক্ষেত্র ও কূটনৈতিক: দুই দিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য এই সংঘাত থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় হলো ইরানি জনগণের দাবি মেনে নেওয়া।

ইসরায়েলের উদ্বেগ

এই যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার জন্য মরিয়া হয়ে আছে ইসরায়েল। দাবি, সামরিকভাবে প্রস্তুত তারা। তবে, শান্তির পথ বেঁছে না নিয়ে বারবার হামলার পথই বেঁছে নিচ্ছে দেশটি। বিশ্লেষকদের দাবি, এখন ইরান, কয়দিন পর হয়তো তুরস্ক কিংবা পাকিস্তান; ইসরায়েল চাচ্ছে সামরিকভাবে এই অঞ্চলে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করা।

এছাড়াও চলমান যুদ্ধে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার পরও সবকিছু লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে দেশটি। এমনকি, ইসরায়েলি ক্ষয়ক্ষতির কোন ধরনের ভিডিও রেকর্ড করলে কঠিন শাস্তির কথাও বলা হয়েছে।

এমনকি, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে আঙ্গুল তোলা ইসরায়েল নিজেদের পারমাণবিক সক্ষমতা কিংবা সক্ষমতা আদৌ রয়েছে কি না, সে বিষয় নিয়ে কখনোও মুখ খোলেনি তেলআবিব।   

এরই মধ্যে ইসরায়েলি গণমাধ্যমের দাবি, ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে তা ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থানের জন্য 'বড় চ্যালেঞ্জ' তৈরি করতে পারে। বিশেষকরে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ছাড় দেওয়া হলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে চূড়ান্ত সমাধান না থাকায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

নেতানিয়াহু শনিবার (২৩ মে) স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় নিরাপত্তা ও জোট নেতাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন বলেও জানা গেছে।

আঞ্চলিক মধ্যস্থতা ও পরবর্তী ধাপ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সমস্যা নিরসনে মধ্যস্থতার অংশ হিসেবে তেহরানের সাথে পাকিস্তানের আলোচনা ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসলামাবাদ।

শনিবার (২৩ মে) ইরানের রাজধানী তেহরানে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারকদের সাথে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে এই তথ্য জানানো হয়। 

সূত্রগুলো বলছে, প্রস্তাবিত রূপরেখায় তিন ধাপে সমঝোতার পরিকল্পনা রয়েছেঃ যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালির সংকট সমাধান এবং পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু।

তবে হোয়াইট হাউস ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এখনো চূড়ান্ত কোনো নথি প্রকাশ করেনি।

অনিশ্চত চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ

যুদ্ধ অবসানে যদি ইরানের সাথে কোন চুক্তি না হয় তাহলে ট্রাম্পের কাছে ২টি পথই খোলা। এক—কিউবায় হামলা করে নিজ দল ও মার্কিনিদের দেখনো যে তিনি একদিকে সফল হয়েছেন। আর এই সফলতা দেখিয়ে নিজের হারানো জনপ্রিয়তা ফিরে পেতে চাবেন ট্রাম্প। কারণ— ইতোমধ্যে ট্রাম্প এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন, ইরান যুদ্ধে যত বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে, তার থেকে কয়েকগুন বেশি অর্থ ভেনেজুয়েলার তেল থেকে আসবে। কিন্তু ভেনেজুয়েলা অভিযানের পর তিনি সেই দেশের মানুষদের উদ্দেশে বলেছিলেন, তেল থেকে আসা অর্থ ভেনেজুয়েলানদের জন্যও খরচ করবেন। কিন্তু নিজের গদি বাঁচানোর অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি। 

অন্যদিকে, নিজের বড় ছেলে ট্রাম্প জুনিয়রের বিয়েতেও যেতে পারবেন না প্রেসিডেন্ট বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউসের দুটি সংশ্লিষ্ট সূত্র। এতেই বোঝা যাচ্ছে, পরিস্থিতি কতটা স্পর্শকাতর। এই সপ্তাহে, হয় চুক্তি হবে নাহলে ২য় পথ হিসেবে ইরানে আবার সামরিক হামলা করা শুরু করবেন ট্রাম্প। 

যদি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ২য় পথ অবলম্বন করেন তাহলে জ্বালানি তেলসহ সবকিছুর দাম আবার নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যাবে। এমনটা না করতে, অর্থাৎ, ইরানে আরেক দফা হামলা 'না' চালাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক পিয়ার্স মরগান।  

শনিবার (২৩ মে) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, নতুন করে বড় ধরনের হামলার আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে। তবে চলমান যুদ্ধে ইতোমধ্যেই যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিশেষকরে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনুরোধ করে পিয়ার্স মরগান বলেন, ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। বলেন, এরমধ্যে নতুন করে আরও বিশৃঙ্খলা তৈরি করা উচিত হবে না। 

ট্রাম্প নিজেও এক সাক্ষাৎকারে বলেন, চুক্তি সফল হওয়ার সম্ভাবনা '৫০-৫০', অর্থাৎ সমঝোতা হতে পারে, আবার পরিস্থিতি আবারও সংঘাতে গড়াতে পারে। বিশ্লেষকদের ধারনা, হুমকি দেওয়া ছাড়া ট্রাম্পের কাছে আর কোন পথ নেই। 

প্রেসিডেন্টের মতো একই সুরে কথা বলেছেন মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মার্কো রুবিও। জানিয়েছেন, এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে 'গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি' হয়েছে এবং খুব শিগগিরই এ বিষয়ে ঘোষণা আসতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, তবে পারমাণবিক ইস্যু এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্নে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

তবে, যুক্তরাষ্ট্রের ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স বা জাতীয় গোয়েন্দা প্রধানের পদ থেকে তুলসি গ্যাবার্ডের পদত্যাগ এবং আর শীর্ষ অফিসারদের সরানো ইঙ্গিত দিচ্ছে যুদ্ধে সুবিধাজনক পজিশনে নেই ট্রাম্প। 

দেখার বিষয়, ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ কি হবে: আবার 'ইরানে হামলা' অথবা 'শান্তি চুক্তি'।