আন্তর্জাতিক

তবে কি আবারও বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা?

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান উত্তেজনা, ইউক্রেন যুদ্ধ ও এশিয়া-প্যাসিফিক সংকটে বাড়ছে বৈশ্বিক উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিশ্ব রাজনীতিতে আবারও “বিশ্বযুদ্ধ” শব্দটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা, ইউক্রেনে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের টানাপোড়েন এবং দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক তৎপরতা—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি পৃথিবী আবারও একটি বড় বৈশ্বিক সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে?

মধ্যপ্রাচ্য: উত্তেজনার কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ সম্প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপ করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ও বাণিজ্যিক ঘাঁটিগুলোকে “বৈধ লক্ষ্যবস্তু” হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি কর্তৃপক্ষকে বিক্ষোভ দমনে কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়ার সতর্কবার্তা দিয়েছেন এবং প্রয়োজনে শক্ত প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য অঞ্চলটিকে একটি বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

ইউক্রেন যুদ্ধ: বিশ্বরাজনীতির বিভাজন

২০২২ সালে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো থামেনি। ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও আর্থিক সহায়তা ইউক্রেনকে শক্তিশালী করলেও, রাশিয়া এটিকে পশ্চিমা জোটের সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। এই যুদ্ধ ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সবচেয়ে বড় সামরিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এশিয়া-প্যাসিফিক: চীন–যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা

তাইওয়ান ঘিরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিযোগিতা বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য আরেকটি বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। চীন একে নিজের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে দাবি করলেও, যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের নিরাপত্তায় সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। সামরিক মহড়া ও নৌ-টহল পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলছে।

তবে কি বিশ্বযুদ্ধ অনিবার্য?

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের বড় অংশ মনে করেন, তাৎক্ষণিকভাবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে—

  • পারমাণবিক নিরুৎসাহ নীতি: পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো জানে, সরাসরি যুদ্ধ মানে পারস্পরিক ধ্বংস।

  • কূটনৈতিক যোগাযোগ: উত্তেজনার মাঝেও ব্যাক-চ্যানেল ডিপ্লোম্যাসি ও জাতিসংঘের মধ্যস্থতা সক্রিয় রয়েছে।

  • অর্থনৈতিক আন্তনির্ভরতা: বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ভেঙে পড়লে সব পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, আঞ্চলিক যুদ্ধ, প্রক্সি সংঘাত এবং ভুল হিসাব থেকে বড় সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

উপসংহার

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও, পূর্ণাঙ্গ বিশ্বযুদ্ধ এখনো অনিবার্য নয়। তবে একাধিক সংঘাত একসঙ্গে চলতে থাকলে বিশ্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। কূটনৈতিক সংযম, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং সংলাপই এই সংকট এড়ানোর একমাত্র পথ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্র: রয়টার্স, আল জাজিরা, ফরেন অ্যাফেয়ার্স, দ্য গার্ডিয়ান, সিএনএন, এপি, বিবিসি নিউজ