মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার (৭ জানুয়ারি) ভারতের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক সৌর জোটসহ (International Solar Alliance—ISA) ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বহুপাক্ষিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার লক্ষ্যে একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। হোয়াইট হাউসের স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, এসব সংস্থা ও চুক্তি “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী” হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই গণপ্রত্যাহারকে ট্রাম্প প্রশাসনের বহুপাক্ষিকতা-বিরোধী নীতির সবচেয়ে বিস্তৃত ও তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে বৈশ্বিক জলবায়ু শাসনব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কাঠামো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গেছে, যেসব সংস্থা ও চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে গেছে, তার প্রায় অর্ধেকই জাতিসংঘের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (UNFCCC)—যা প্যারিস চুক্তিসহ সব প্রধান বৈশ্বিক জলবায়ু উদ্যোগের ভিত্তি।
বিশ্লেষকদের মতে, UNFCCC থেকে বেরিয়ে আসা কেবল একটি চুক্তি ত্যাগ নয়; এটি বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনার মূল কাঠামো থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার ইঙ্গিত। এর আগে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করেছিলেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
ভারত-নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক সৌর জোট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারকে কেবল পরিবেশগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এটি একটি স্পষ্ট ভূরাজনৈতিক বার্তা।
আন্তর্জাতিক সৌর জোটের লক্ষ্য ছিল উন্নয়নশীল ও সূর্যপ্রাচুর্য দেশগুলোতে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগ জোরদার করা। যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশের সরে যাওয়া জোটটির অর্থায়ন ও প্রযুক্তি বিনিময় প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
একাধিক কূটনৈতিক সূত্র বলছে, এতে ভারতসহ বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর নেতৃত্বাধীন জলবায়ু উদ্যোগ দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও আইনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদনের জন্য সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন হলেও, চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই।
পরিবেশবাদী সংগঠন সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল ডাইভার্সিটির আইনজীবী জিন সু বলেন,
“UNFCCC থেকে একতরফাভাবে সরে যাওয়া প্যারিস চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার চেয়েও গুরুতর এবং আইনি দিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ।”
আইনি বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি আদালতে গড়ালে এটি একটি সাংবিধানিক নজিরে পরিণত হতে পারে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা এখন “প্রগতিশীল ও বিশ্বায়নবাদী মতাদর্শে” পরিচালিত হচ্ছে এবং মার্কিন সার্বভৌমত্বকে সীমিত করছে।
তিনি বলেন,
“DEI থেকে শুরু করে তথাকথিত লিঙ্গ সমতা প্রচারণা—অনেক সংস্থা এমন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে যা আমেরিকার স্বার্থের বিরুদ্ধে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে রুবিও দাবি করেন, ট্রাম্প আমেরিকান জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিশ্বায়নবাদী কাঠামো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনছেন।
বিশ্ব রাজনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু নেতৃত্বের শূন্যস্থান পূরণে চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের জলবায়ু বিশেষজ্ঞ লি শুও এই সিদ্ধান্তকে
“বিশ্ব জলবায়ু কর্মকাণ্ডের জন্য একটি বড় পশ্চাদপসরণ”বলে মন্তব্য করেছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা ও চুক্তি থেকে প্রত্যাহার বৈশ্বিক রাজনীতিতে একটি গভীর দাগ ফেলতে পারে। এটি শুধু জলবায়ু ইস্যুতেই নয়, বরং বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলেছে।