আন্তর্জাতিক

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ: ক্লান্ত পশ্চিম, লাভবান কে?

ক্ষমতার হাল ধরে রাখতে শুরু হওয়া যুদ্ধের পালে বাতাস দিয়েছে আমেরিকাসহ পুরো ইউরোপ। তবে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

দীর্ঘ যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা

২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন এটি হবে স্বল্পমেয়াদি সংঘাত। কিন্তু দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে যুদ্ধ এখন এক ধরনের “স্থায়ী সংকট”-এ পরিণত হয়েছে। সামরিক অচলাবস্থা, অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক ক্লান্তি, সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে: পশ্চিমা জোট কি ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে? আর এই দীর্ঘ যুদ্ধ থেকে আসলে লাভবান হচ্ছে কারা?

পশ্চিমা বিশ্বের ক্লান্তি: বাস্তবতা নাকি কৌশলগত বিরতি?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যুদ্ধের শুরুতে দ্রুত ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখালেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই গতি কিছুটা কমেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন, দুই পক্ষই বিপুল সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়েছে ইউক্রেন-কে। কিন্তু কয়েকটি বাস্তবতা এখন সামনে আসছে-

অর্থনৈতিক চাপ: উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, এবং বাজেট ঘাটতি পশ্চিমা দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে।

রাজনৈতিক বিভাজন: বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-এ সহায়তা নিয়ে কংগ্রেসে মতভেদ বাড়ছে।

জনমতের পরিবর্তন: দীর্ঘ যুদ্ধের ফলে সাধারণ জনগণের মধ্যে 'যুদ্ধক্লান্তি' (war fatigue) তৈরি হয়েছে।

এই ক্লান্তি পুরোপুরি পিছু হটার ইঙ্গিত না হলেও, সহায়তার গতি ও অগ্রাধিকার বদলে দিচ্ছে।

মাঠের বাস্তবতা: অচলাবস্থা ও ক্ষয়যুদ্ধ

যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা লাইন এবং ইউক্রেনের পাল্টা আক্রমণ, দুটিই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে আটকে আছে।

রাশিয়া ধীরে ধীরে তার অবস্থান ধরে রেখে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার কৌশল নিয়েছে, যা “ক্ষয়যুদ্ধ” (war of attrition) হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে ইউক্রেন পশ্চিমা সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থেকে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

লাভবান কে? বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ

১. রাশিয়া: সীমিত সাফল্য, কিন্তু কৌশলগত স্থিতি

যদিও দ্রুত বিজয় অর্জন করতে পারেনি রাশিয়া, তবে কিছু ক্ষেত্রে তারা লাভবান-

  • জ্বালানি রপ্তানি নতুন বাজারে (এশিয়া) সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে

  • অভ্যন্তরীণভাবে যুদ্ধ অর্থনীতি গড়ে তুলেছে

  • পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি

২. চীন: নীরব কৌশলগত সুবিধাভোগী

চীন সরাসরি যুদ্ধে না থেকেও বড় সুবিধা পাচ্ছে-

  • রাশিয়ার সাথে বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতা বাড়িয়েছে

  • পশ্চিমা বিশ্বের মনোযোগ ইউরোপে আটকে থাকায় ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজের অবস্থান শক্ত করছে

  • বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থার (ডলার নির্ভরতা কমানো) প্রচার করছে

৩. অস্ত্রশিল্প: যুদ্ধের অর্থনীতি

  • বিশ্বের বড় বড় প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো এই যুদ্ধ থেকে বড় আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে।

  • অস্ত্র উৎপাদন ও রপ্তানি বেড়েছে

  • নতুন প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদিত হচ্ছে ইউরোপজুড়ে

৪. গ্লোবাল সাউথ: সুযোগ ও সংকটের দ্বৈততা

গ্লোবাল সাউথ দেশগুলো এই যুদ্ধে দ্বৈত প্রভাব দেখছে-

  • একদিকে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে চাপ তৈরি করছে

  • অন্যদিকে নতুন বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে

বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা, বৈশ্বিক সংঘাতের ঢেউ সরাসরি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে আঘাত হানে।

জ্বালানি রাজনীতি: ইউরোপের পুনর্গঠন

ইউরোপ দীর্ঘদিন রাশিয়ান গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ছিল। যুদ্ধের পর

  • বিকল্প জ্বালানি উৎস খোঁজা শুরু হয়েছে

  • নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বেড়েছে

  • যুক্তরাষ্ট্র থেকে LNG আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে

এটি দীর্ঘমেয়াদে ইউরোপের জ্বালানি নীতিকে আমূল বদলে দিচ্ছে।

নতুন জিওপলিটিক্স: ব্লক রাজনীতির পুনরুত্থান

এই যুদ্ধ আবারও বিশ্বকে দুটি বড় ব্লকে ভাগ করার ইঙ্গিত দিচ্ছে-

  • পশ্চিমা জোট বনাম রাশিয়া-চীন ঘনিষ্ঠতা

  • নিরপেক্ষ বা ভারসাম্য রক্ষাকারী দেশগুলোর উত্থান

এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আবার “Cold War-lite” পর্যায়ে যাচ্ছে বলে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা।

ভবিষ্যৎ: যুদ্ধের শেষ কোথায়?

যুদ্ধের দ্রুত সমাধানের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নেই। সম্ভাব্য তিনটি পথ-

1. দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা

2. সীমিত শান্তি চুক্তি

3. সংঘাতের বিস্তার

প্রতিটি ক্ষেত্রেই বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে গভীর প্রভাব পড়বে।

ক্লান্তি, কৌশল ও পরিবর্তনের যুগ

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়; এটি বৈশ্বিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু। পশ্চিমা বিশ্বের ক্লান্তি বাস্তব হলেও, সেটি পুরোপুরি পিছু হটার নয়, বরং কৌশলগত পুনর্গঠন।

অন্যদিকে, এই দীর্ঘ যুদ্ধের ভেতর দিয়ে নতুন শক্তিগুলো নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে। ফলে প্রশ্নটি সহজ নয়, “লাভবান কে?”। বরং বলা যায়, এই যুদ্ধে কেউ পুরোপুরি জয়ী নয়, কিন্তু অনেকেই আংশিকভাবে লাভবান।