দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোয় মার্কিন ডলার শুধু একটি মুদ্রা নয়; বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, রিজার্ভ, জ্বালানি লেনদেন এবং আর্থিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। বিশ্বের অধিকাংশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় ঋণ এখনো ডলারনির্ভর।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে “de-dollarization” বা ডলার নির্ভরতা কমানোর আলোচনা আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে BRICS জোটের সম্প্রসারণ, চীনা ইউয়ান-ভিত্তিক বাণিজ্য এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি এই বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে।
প্রশ্ন হলো- এটি কি সত্যিই বৈশ্বিক অর্থনীতির বড় পরিবর্তনের সূচনা, নাকি মূলত রাজনৈতিক বার্তা?
১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস চুক্তি-এর মাধ্যমে ডলার বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে উঠে আসে। পরে-
তেল বাণিজ্যে “petrodollar” ব্যবস্থা
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি
আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব
-সব মিলিয়ে ডলার হয়ে ওঠে বৈশ্বিক “safe haven currency”।
আজও-
বৈশ্বিক রিজার্ভের বড় অংশ ডলারে
আন্তর্জাতিক পেমেন্টের বড় অংশ ডলারে
জ্বালানি বাণিজ্যের প্রধান মুদ্রা ডলার
অর্থাৎ, ডলারের শক্তি শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি রাজনৈতিক ও কৌশলগতও।
১. পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-এর পর রাশিয়া-র ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা বিশ্বকে একটি বড় বার্তা দেয়-
ডলারনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার হারালে একটি দেশের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ফলে অনেক দেশ বিকল্প ব্যবস্থা খোঁজার প্রয়োজন অনুভব করছে।
২.চীনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশল
চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হলেও আন্তর্জাতিক লেনদেনে তার মুদ্রার ব্যবহার তুলনামূলক কম।
এ কারণে চীন-
Yuan-based trade বাড়াচ্ছে
দ্বিপাক্ষিক মুদ্রা চুক্তি করছে
বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেম তৈরি করছে
বিশেষ করে জ্বালানি বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা চীনের বড় কৌশলগত লক্ষ্য।
৩.‘BRICS’- এর বিকল্প অর্থনৈতিক ভাবনা
‘BRICS’, যার সদস্যদের মধ্যে রয়েছে-
ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা। নিজেদের অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়াতে বিকল্প লেনদেন কাঠামো নিয়ে আলোচনা করছে।
নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ার ফলে এই জোটের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বও বেড়েছে।
চীন ইতোমধ্যে কয়েকটি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে-
সৌদি আরবের সাথে Yuan-based energy discussion
রাশিয়া-চীন বাণিজ্যে ডলারের ব্যবহার কমানো
এশিয়া ও আফ্রিকার কিছু দেশে Yuan settlement বৃদ্ধি
তবে বাস্তবতা হলো-
চীনা ইউয়ান এখনো পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা নয়।
কারণ-
Yuan পুরোপুরি মুক্তভাবে convertable নয়
চীনের আর্থিক বাজারে স্বচ্ছতার সীমাবদ্ধতা
আন্তর্জাতিক আস্থার প্রশ্ন
অর্থাৎ, ইউয়ানের অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেও সেটি এখনো ডলারের বিকল্প হয়ে ওঠেনি।
BRICS জোটের অভিন্ন মুদ্রা তৈরির আলোচনা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এটি অত্যন্ত জটিল।
মূল চ্যালেঞ্জগুলো-
১. সদস্যদের ভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থ
চীন, ভারত, রাশিয়া- তিন দেশের কৌশলগত লক্ষ্য এক নয়।
২. রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা
BRICS-এর ভেতরেও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে।
৩. কেন্দ্রীয় আর্থিক কাঠামোর অভাব
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো একক আর্থিক নীতি বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নেই।
ফলে BRICS currency এখনো একটি রাজনৈতিক ধারণা বেশি, কার্যকর অর্থনৈতিক বাস্তবতা কম।
মধ্যপ্রাচ্য: নতুন অর্থনৈতিক ভারসাম্যের কেন্দ্র
সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলো এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তারা এখন-
* যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখছে
* একইসঙ্গে চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়াচ্ছে
এই “multi-alignment” কৌশল মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন অর্থনৈতিক ভারসাম্যের কেন্দ্রে পরিণত করছে।
বাস্তবতা হলো-
ডলারের আধিপত্য কমার আলোচনা যতটা জোরালো, বাস্তব পরিবর্তন ততটা দ্রুত নয়।
কারণ ডলারের পক্ষে এখনো কয়েকটি বড় শক্তি কাজ করছে-
* যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক আকার
* বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা
* শক্তিশালী আর্থিক বাজার
* আন্তর্জাতিক ঋণ ও বাণিজ্যের কাঠামো
বিশ্বে সংকট দেখা দিলে এখনো বিনিয়োগকারীরা ডলারের দিকেই ঝুঁকে পড়ে।
১. পূর্ণ প্রতিস্থাপন নয়, বৈচিত্র্য বৃদ্ধি- বিশ্ব সম্ভবত “post-dollar world”-এ যাচ্ছে না; বরং “less dollar-dependent world”-এর দিকে এগোচ্ছে।
২. অর্থনীতির সাথে ভূরাজনীতির মেলবন্ধন- মুদ্রা এখন শুধু আর্থিক বিষয় নয়; এটি কৌশলগত অস্ত্রও।
৩. বহুমুখী আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠা- ভবিষ্যতে আঞ্চলিক মুদ্রাভিত্তিক লেনদেন বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই পরিবর্তনের কয়েকটি দিক গুরুত্বপূর্ণ-
* ডলার সংকটের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ
* বিকল্প বাণিজ্য মুদ্রা ব্যবহারের সম্ভাবনা
* তবে অতিরিক্ত ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জও থাকবে
অর্থাৎ, সুযোগ ও ঝুঁকি, দুটিই রয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে একক মুদ্রা-নির্ভরতা থেকে বহুমাত্রিক কাঠামোর দিকে এগোতে পারে-
* ডলার প্রধান থাকবে
* তবে Yuan, Euro এবং আঞ্চলিক মুদ্রার ব্যবহার বাড়বে
* রাজনৈতিক বিভাজন অর্থনৈতিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করবে
“ডলার ছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য” এখনো বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা। তবে এটিকে পুরোপুরি প্রতীকী বলাও ভুল হবে।
কারণ বিশ্বের বহু দেশ এখন অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমাতে বিকল্প পথ খুঁজছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-
ডলারের আধিপত্য হয়তো রাতারাতি শেষ হবে না, কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে আরও বহুমুখী ও রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত আর্থিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে।
এবং সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রেই রয়েছে BRICS, Yuan trade এবং বৈশ্বিক শক্তির নতুন প্রতিযোগিতা।