বিশ্বজুড়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ডুমসডে ক্লক (Doomsday Clock) — একটি প্রতীকী সময়পত্রিকা যা মানবজাতির সামনে সম্ভাব্য বৈশ্বিক বিপর্যয়ের সময়কে নির্দেশ করে। প্রতিমাসে বা বছরের শুরুতে আপডেট হওয়া এই ক্লকটি মূলত বলে দেয় বিশ্ব কিসের কাছে দাঁড়িয়ে এবং কতটা ঝুঁকির মুখে।
১৯৪৭ সালে Bulletin of the Atomic Scientists-এর উদ্যোগে এটি তৈরি হয়েছিল, যাতে সাধারণ মানুষ ও রাষ্ট্রনেতাদের সতর্ক করা যায় যে মানবজাতি নিজেই তৈরি করা প্রযুক্তির কারণে সৃষ্ট সংকটের সম্মুখীন হতে পারে।
সাম্প্রতিক ২০২৫ সালের আপডেটে ডুমসডে ক্লককে মধ্যরাতের নির্দিষ্ট স্থানের মাত্র ৮৯ সেকেন্ড আগে স্থির করা হয়েছে — ইতিহাসে এটি সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থান। অর্থাৎ, গত বছরের ৯০ সেকেন্ড থেকে এটি আরও ১ সেকেন্ড বেশি বিপজ্জনক অবস্থানে চলে এসেছে।
এই সংকেতটি কোনো প্রযুক্তিগত সময়-মাপ নয় বরং একটি বিশ্বব্যাপী সতর্কবার্তা — যে মানবজাতি ধরিত্রীকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা ডুমসডে ক্লকের সময় এই অবস্থায় রাখার কারণ হিসেবে কয়েকটি মূল বিষয় তুলে ধরেছেন:
পারমাণবিক শস্ত্রসম্ভার ও উত্তেজনা
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক হুমকি ও বড় শক্তিগুলোর সংঘাতের ঝুঁকি বেশি।
জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয়
অগ্রসর বিশ্ব অর্থনীতি ও শিল্পায়নের কারণে জলবায়ুর পরিবর্তন গতি কমেছে না—বরং তীব্র হচ্ছে।
জীবাশ্মিক ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকি
এআই (Artificial Intelligence), বায়ো-প্রযুক্তি ও অন্যান্য উদীয়মান প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণহীন হলে তা বিপর্যয়ের পথটা দ্রুত করতে পারে।
এই কারণগুলো মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা ক্লককে মধ্যরাতের আরও কাছে টেনে আনছেন—যা ইঙ্গিত দেয় যে বিশ্ব এখন “সামান্য সময়েই” ক্রিটিক্যাল পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।
ডুমসডে ক্লক সরাসরি সময় নয় এবং এটি বলে না আগামী সপ্তাহ বা বছরেই পৃথিবী শেষ হয়ে যাবে। এটি একটি মেটাফোর বা প্রতীক, বিশ্ব নেতাদের এবং জনগণকে জানানোর জন্য যে বর্তমান অবস্থায় যদি উন্নতি না করা হয়, তাহলে মানবজাতি বিপদের মুখোমুখি হবে।
এই ক্লকটি আরোপ করে না কোনো ভবিষ্যদ্বাণী, বরং একটি সতর্কবার্তা সিস্টেম —
- গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো,
-পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ,
- আন্তর্জাতিক শান্তি সুরক্ষা,
- ঝুঁকিপূর্ণ প্রযুক্তিগুলোর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ,
—এসব ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বিশ্বকে অনুরোধ করে।
ডুমসডে ক্লক ১৯৪৭ সালে প্রথম ৭ মিনিট আগে থেকে শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে এটি সময়ের সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকির ভিত্তিতে দাঁড়িয়েছে আরও কাছে:
১৯৪৯: ৩ মিনিট
১৯৫৩: ২ মিনিট
১৯৯১: ১৭ মিনিট (সবচেয়ে নিরাপদ সময়)
২০২৫: ৮৯ সেকেন্ড — সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থান
এই হিসাব বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়গুলো—যেমন পারমাণবিক হুমকি, বিশ্ব যুদ্ধ বা উত্তেজনার সময়—এর সাথে তুলনা করে তৈরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্লক যতই কাছে এগোচ্ছে, ততই বোঝা যাচ্ছে—
- বিশ্ব নেতারা ঐকমত্যে অক্ষম — পারমাণবিক হুমকি ও রাজনৈতিক বিরোধ কেটে না;
- জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেই — নির্গমন কমছে না;
- প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন দ্রুত, অথচ নিয়ন্ত্রণ পিছিয়ে — বিশেষ করে AI ও বায়োথ্রেট।
এই পরিস্থিতি মানবজাতির সময় ফুরিয়ে আসছে—এটিকে সাজানো আবহ নয়, বরং কর্মের অনুপস্থিতি ও ভুল নীতির প্রতিফলন বলা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, যদি পারমাণবিক যুদ্ধ, জলবায়ু বিপর্যয় বা নিয়ন্ত্রণহীন প্রযুক্তি মোকাবেলায় কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে বিশ্বের স্থিতিশীলতা ও মানুষের জীবিকা বিপন্ন হয়ে পড়বে।
ডুমসডে ক্লক মানবজাতির “শেষ সময়” পরিমাপ করে না—এটি একটি সতর্ক সংকেত।
৮৯ সেকেন্ড-এর মানে এই নয় যে এখনই পৃথিবীর শেষ, বরং তা বলে:
বিশ্ব সামগ্রিকভাবে বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে এবং দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে সেই বিপর্যয় “বহু দূরে” নয়।
কাঁটায় কাঁটা দিয়ে বললে আজকের ডুমসডে ক্লক আমাদের জানান দেয়—সময় ফুরিয়ে আসছে না, বরং সময় যাচ্ছে কাজ না করলে সেটা সত্যিকারের বিপদের সামনে দাঁড়ানো হতে পারে।