ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)–কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষনা করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এ সিদ্ধান্ত ২৯ জানুয়ারি ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রিদের বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়েছে এবং এটি ইরান–ইউরোপ সম্পর্কের একটি বড় মোড় বলে অভিহিত করা হচ্ছে।
ইইউ পররাষ্ট্র নীতির প্রধান কাজা কালাস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, “যে কোনো শাসনযন্ত্র যা নিজেরই নাগরিকদের বিরুদ্ধে রক্তপাত করে, তাকে সন্ত্রাসী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।”
এর ফলে আইআরজিসিকে আল-কায়েদা, আইএস ও হামাসের মতো সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সমপর্যায়ে তালিকাবদ্ধ করা হয়েছে।
ইইউ বলছে, সিদ্ধান্তের মূল পেছনের কারণগুলো হচ্ছে—
- ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমন– IRGC–কে আইরান সরকারের কঠোর দমন-পীড়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখায়, বিশেষত সাম্প্রতিক আন্দোলনে প্রচুর প্রাণহানির অভিযোগের প্রেক্ষিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
- ইরানের ভূমিকা ও প্রভাব– কোনও সরকারি বাহিনী হলেও IRGC–কে ইরান সরকারের বাইরে একটি শক্তিশালী ও নির্বাহী প্রভাবশালী গোষ্ঠী হিসেবে দেখা হয়, যা শুধু সুরক্ষা নয়, বরং দেশীয় ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতায়ও ভূমিকা রাখে বলে ইইউ ধারণা করছে।
ইইউ কমিশনার উরসুলা ভন ডার লেইয়ন বলেছেন, “এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষিত ছিল এবং এটি ইরানের শাসনব্যবস্থাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয় যে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিক্ষোভ দমন অতীতের মতো রাখাও যাবে না।”
এই ঘোষণার ফলে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো কার্যকর হবে—
- সম্পদ জমা – IRGC–এর সদস্যদের বৈদেশিক ব্যাংক হিসাব, সম্পদ ও ফান্ডিং উৎসগুলোর উপর নিষেধাজ্ঞা
- ভিসা নিষেধাজ্ঞা – সংগঠনে যুক্ত কর্মকর্তা ও সদস্যদের জন্য ইউরোপে ভিসা নিষিদ্ধ
- আইনি ফল – ইইউ–র মাধ্যমে IRGC–কেও আর্থিক বা নেটওয়ার্ক সহযোগিতা দিলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে
- ছাপানো নাম্বারড তালিকা – সন্ত্রাসী সংগঠন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে আইনি চাপ বৃদ্ধি পাবে
ইইউ–র পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই পদক্ষেপ শুধু প্রতীকী নয়—এটি আইনগত এবং অর্থনৈতিক প্রভাবও তৈরি করবে, যাতে IRGC–র আন্তর্জাতিক কার্যক্রম সীমাবদ্ধ হতে পারে।
ইরানি কর্মকর্তারা ইইউ–র এই সিদ্ধান্তকে “অসঙ্গত, প্রতিক্রিয়াশীল ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চালানো” বলে সমালোচনা করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি ইরানি–ইউরোপ সম্পর্ককে বিভাজনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, এবং এ ধরনের হুমকির ফলে ইউরোপীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে সতর্ক করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইইউ–র এই ঘোষণা একটি ধারণাগত পরিবর্তন তুলে ধরছে—যেখানে একটি রাষ্ট্রীয় সামরিক বাহিনীকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে আইনিভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এটি দীর্ঘসময়ের দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অঞ্চলে অস্থিতিশীলতার অংশ হিসেবে ইরানের ভূমিকাকে নতুন কূটনৈতিক ও আইনি দৃষ্টিতে তুলে ধরা হচ্ছে।
এতে সম্ভাব্য প্রভাব—
- ইরান ও ইউরোপের সম্পর্ক আরও কটাক্ষাত্মক হতে পারে
- মধ্যপ্রাচ্যে ইতোমধ্যেই উত্তেজনার মধ্যে নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে
- ইরানের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই চলমান মার্কিন ও অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার হওয়া সম্ভব
তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে এই ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সমাজের একটি নেতৃত্বমূলক ও নৈতিক বার্তা হিসেবেও কাজ করছে।
- ইইউ–র সিদ্ধান্তের মাধ্যমে IRGC–কে আল-কায়েদা, হামাস ও আইএস–এর মতো সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় রাখা হল।
- এই পদক্ষেপ মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিক্ষোভ দমন ও সমর্থন ছেঁটে দেয়ার উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছে।
- ইরান ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।
- আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা ও কূটনৈতিক চাপ আরো বৃদ্ধি পেতে পারে।