গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুগপৎ হামলা শুরু করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর অধীনস্থ সেনাবাহিনী। হামলার শুরু থেকেই ইরানকে হুমকি-ধামকির ওপরেই রেখেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
যুদ্ধের ৩৯ দিন পার হওয়ার পর নিজেরই বেঁধে দেওয়া ‘সভ্যতা ধ্বংস’ করার সময়সীমার একেবারে শেষ মুহূর্তে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি দেন ট্রাম্প।
কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠার ‘যুদ্ধবিরতির’ দুই দিন যেতে না যেতেই আবারও হুমকির ভাষায় ফিরেছেন ট্রাম্প। এবার জানালেন, এটা আসল চুক্তি নয়। ‘আসল চুক্তি’ না হওয়ার পর্যন্ত ইরানের আশেপাশেই থাকবে মার্কিন সেনারা।
আজ বৃহস্পতিবার এই তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি।
আসল চুক্তি
নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প জানান, ইরানের সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য আকারে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
মার্কিন নেতা দাবি করেন, প্রয়োজন দেখা দিলে, আবারও ওই ‘শত্রুর’ বিরুদ্ধে প্রাণঘাতি হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হবে। সেটা কার্যকর করার জন্য যত মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান, সেনা, বাড়তি গোলাবারুদ, অস্ত্র ও অন্যান্য যা যা দরকার, তা সবই ইরানের আশেপাশে মোতায়েন রাখা হবে।
‘যতক্ষণ পর্যন্ত না “আসল চুক্তি” হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ইরানের আশেপাশে থাকবে সেনা’, যোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
এরপর ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেন, চুক্তি চূড়ান্ত না হলে ‘আরও বড়, আরও ভয়াবহ ও আরও শক্তিশালী’ হামলা চালানো হবে এবং চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এসব হামলা চলতেই থাকবে।
ট্রাম্প বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমাদের মহান সামরিক বাহিনী বিশ্রাম নিচ্ছে এবং নিজেদেরকে আরও সুসংহত করে নিচ্ছে। তারা পরবর্তী লক্ষ্য পূরণের জন্য মুখিয়ে আছে। আমেরিকা ফিরে এসেছে!’
ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বুধবার দিনের শেষভাগে ট্রাম্প ওই তথ্য জানান। বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে ‘দুর্বল ও ভঙ্গুর’ আখ্যা দিয়েছেন। ট্রাম্পের হুমকিতে এর ভবিষ্যৎ যেন আরও নড়বড়ে হয়ে উঠল।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শেহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের মধ্যস্থতায় অসম্ভবকে সম্ভব করে দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি দেয়। শেহবাজ শরিফ ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত সংশ্লিষ্ট সকল যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে।
অর্থাৎ, শর্ত মেনে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোতে হামলা বন্ধ করবে, যেমন কাতার, আমিরাত ও সৌদি আরব। অপরদিকে ইরানের সঙ্গ একাত্মতা প্রকাশ করে ইয়েমেনের হুতি ও লেবাননের হিজবুল্লাহও এই সংঘাতে জড়িয়েছিল। ইয়েমেনে হামলা না চালালেও লেবাননে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। তাদের এসব হামলায় ২৫০ জনেরও বেশি নিহত হয়েছেন।
এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ইসরায়েলি নেতা দাবি করেছেন, ‘লেবানন এই চুক্তির বাইরে’।
বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননে হামলা অব্যাহত রাখার কারণেই ভেস্তে যেতে পারে যুদ্ধবিরতি চুক্তি।
চলমান যুদ্ধবিরতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার আরেক উপকরণ হলো পারস্য উপসাগর সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি।
ইরান বলছে, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সময়টুকুতে হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। তবে শর্ত হলো, ইরানের হাতেই এর আধিপত্য বজায় থাকবে।
এ বিষয়টি নিয়েও মতবিরোধের সম্ভাবনা আছে।
অপরদিকে, ‘আসল চুক্তিতে’ অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ইরান কয়েকটি দাবি জানিয়েছে। ফার্সি ভাষায় লিখিত দাবিগুলো ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে।
অন্যান্য দাবির মধ্যে আছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প মেনে নেওয়ার আহ্বান।
তবে জাতিসংঘের মাধ্যমে ইরানের দাবির একটি তালিকা প্রকাশ পেয়েছে। সেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের দাবিটি অন্তর্ভুক্ত নেই।
পাশাপাশি, ট্রাম্প জানিয়েছেন, সমৃদ্ধকরণের বিষয়টি চুক্তিতে নিয়ে আসা হবে।
আগামী শুক্রবার পাকিস্তানে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে দরকষাকষিতে অংশ নেবে ওয়াশিংটন-তেহরান।
এর আগে ট্রাম্প জানান, ‘ইরানের হাতে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না’ এবং ‘হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত ও নিরাপদ থাকবে।’