ফরিদপুরের ভাঙা উপজেলার কাউলিবেড়া ইউনিয়নের মাইঝাইল পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাটি শুধু একটি এলাকার আলোড়ন নয়; এটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বিশ্বাসের জায়গা এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঘিরে একাধিক মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে।
প্রায় আট মাস ধরে ওই মসজিদে ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করা দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী হয়ে গোপনে ধর্মীয় প্রচারণা চালানোর অভিযোগ ওঠার পর এলাকায় তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতির অবনতি রোধে পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নেয় এবং অভিযুক্ত দুজনকে আটক করে। পরদিন তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, বুধবার দুপুরে বিষয়টি প্রথম নজরে আসে পাশের মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা শফিকুল ইসলামের। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ওই দুই ইমামের কথাবার্তা ও আচরণে অসংগতির লক্ষণ লক্ষ্য করছিলেন। সন্দেহ আরও গভীর হয় যখন একজন ইমাম তাকে ব্যক্তিগতভাবে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণের প্রস্তাব দেন এবং এর বিনিময়ে বিপুল অর্থ, উন্নত দেশে ভ্রমণসহ নানা প্রলোভনের কথা বলেন।
বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন এবং পরে স্থানীয় ইমাম, মসজিদ কমিটির সদস্য ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অবহিত করেন। এরপর মসজিদ কমিটির উদ্যোগে ইমামদের থাকার কক্ষে তল্লাশি চালানো হয়।
তল্লাশিকালে ইমামদের কক্ষ থেকে খ্রিস্টান ধর্মসংক্রান্ত লিফলেট, কাগজপত্র এবং যিশু খ্রিস্ট সম্পর্কিত বই উদ্ধার করা হয়। এসব আলামত দেখে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন মসজিদ কমিটির সহসভাপতি আইয়ুব আলী বেপারী।
পরবর্তীতে বিষয়টি ভাঙ্গা থানাকে জানানো হলে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযুক্ত দুজনকে আটক করে। আটককৃতরা হলেন বাগেরহাট জেলার ডুবাতলা এলাকার আবুল কাশেমের ছেলে সরোয়ার হোসেন (৪৫) এবং একই জেলার মনির খা এলাকার রস্তুম আলীর ছেলে মো. হাবিব উল্লাহ (৪৫)।
ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আলীম জানান, উদ্ধারকৃত আলামত ও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় মসজিদ কেবল নামাজের স্থান নয়; এটি ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা ও সামাজিক আস্থার কেন্দ্র। একজন ইমাম শুধু ধর্মীয় নেতা নন, তিনি স্থানীয় সমাজে বিশ্বাসের প্রতীক।
সে জায়গায় ইমাম পরিচয়ে ভিন্ন ধর্মের গোপন প্রচারণার অভিযোগ ওঠা মানে সেই আস্থার ভিত নড়ে যাওয়া। এ কারণেই ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়।
এটি কোনো ধর্মীয় বিতর্ক বা মতবিনিময়ের ঘটনা নয়; বরং অভিযোগটি হলো-
পরিচয় গোপন করে
ধর্মীয় দায়িত্বের আড়ালে
পরিকল্পিতভাবে প্রচারণা চালানো
এই তিনটি বিষয়ই ঘটনাটিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তোলে।
এই ঘটনা কয়েকটি কাঠামোগত দুর্বলতাও সামনে এনেছে-
১. ইমাম নিয়োগে যাচাইয়ের ঘাটতি
গ্রামাঞ্চলের বহু মসজিদে ইমাম নিয়োগ হয় স্থানীয় পরিচয় ও সুপারিশের ভিত্তিতে। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই, পূর্ববর্তী দায়িত্ব বা আদর্শিক অবস্থান যাচাই অনেক সময়ই অনুপস্থিত থাকে।
২. দীর্ঘ সময় ধরে নজরদারির অভাব
প্রায় আট মাস ধরে দায়িত্ব পালনের পর বিষয়টি সামনে আসা দেখায়, নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহির ঘাটতি ছিল।
৩. ধর্মীয় স্থাপনার নিরাপত্তা প্রশ্ন
মসজিদের ভেতরে ধর্মবহির্ভূত প্রচারসামগ্রী থাকা শুধু একটি অপরাধের অভিযোগ নয়; এটি ধর্মীয় স্থাপনার নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
এ ধরনের ঘটনা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, বিশেষ করে যদি গুজব, অতিরঞ্জন বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা ছড়ায়। তাই প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ ও আইনি প্রক্রিয়ার পথে বিষয়টি নেওয়া ইতিবাচক।
একই সঙ্গে দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণ, সংযম এবং যাচাই ছাড়া মন্তব্য বা প্রচার থেকে বিরত থাকাও জরুরি।
ফরিদপুরের ভাঙার ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা শুধু বিশ্বাসের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না; সেখানে জবাবদিহি, যাচাই ও প্রাতিষ্ঠানিক সতর্কতা প্রয়োজন।
বিশ্বাসের জায়গায় সামান্য ফাঁক থাকলেই সেখানে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশ সম্ভব হয়। এই ঘটনা সেই ফাঁকগুলো চিহ্নিত করার সুযোগ করে দিয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই শিক্ষা নেব?