বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। কিন্তু এই নদীগুলোই এখন অনেকের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধলেশ্বরী, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা থেকে শুরু করে পদ্মা-মেঘনা—দেশের প্রায় সব বড় নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে ভয়াবহ নদীভাঙন একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে রূপ নিয়েছে। আর এই সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করছে অবৈধ বালু উত্তোলন, যা এখন একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের নিয়ন্ত্রণে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীভাঙন আংশিক প্রাকৃতিক হলেও বর্তমানে এর তীব্রতা অনেকাংশেই মানবসৃষ্ট। বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রায় ২৫ হাজার একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর থেকে ৬০ থেকে ৮০ লাখ মানুষ নদীভাঙনের শিকার হয়েছে এবং প্রায় ২ হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এলাকা হারিয়ে গেছে নদীতে।
প্রতিবছর নতুন করে প্রায় ২ থেকে ২.৫ লাখ মানুষ গৃহহীন হচ্ছে। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এসব পরিসংখ্যান শুধু একটি পরিবেশগত সংকট নয়, বরং একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরে।
স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ছায়াতেই চলে বালু উত্তোলন
নদীভাঙনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে অবৈধ বালু উত্তোলন। দেশের বিভিন্ন নদী থেকে ড্রেজার বসিয়ে অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলার ফলে নদীর তলদেশে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এতে নদীর স্রোত পরিবর্তিত হয়ে তীরভাঙন ত্বরান্বিত হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই বালু উত্তোলন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে চলা এসব কার্যক্রমে প্রশাসনের একটি অংশের নীরব ভূমিকা বা দুর্বল নজরদারিও প্রশ্নবিদ্ধ।
বাংলাদেশে বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণে আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্থান ও পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের অনুমতি থাকলেও বাস্তবে তা মানা হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই নদীর তীরের কাছাকাছি বা বসতবাড়ির পাশ থেকেই বালু তোলা হয়, যা সরাসরি ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ায়।
দূর্বল ও দ্বায়সারা বাঁধে রক্ষা হয় না জনজীবন
নদীর পাড় রক্ষায় সরকার বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিলেও তা বাস্তবায়নে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। প্রকৌশলগতভাবে যে মান বজায় রেখে নদীতীর সংরক্ষণ করার কথা, তা অনেক সময় করা হয় না। ফলে প্রকল্প থাকলেও তা কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়।
নদীভাঙনের সবচেয়ে বড় শিকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। এক রাতে ঘরবাড়ি হারিয়ে তারা হয়ে যায় উদ্বাস্তু। জমি হারিয়ে জীবিকা হারায়, শিক্ষা বন্ধ হয়, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে, একটি পরিবার ধীরে ধীরে সামাজিকভাবে ভেঙে পড়ে।
অনেকেই শহরে গিয়ে বস্তিতে আশ্রয় নেয়, কেউবা আবার নতুন করে নদীর চরে বসতি গড়ে, এক অনিশ্চিত জীবনের চক্রে আটকে পড়ে তারা।
অবৈধ বালু উত্তোলন শুধু ভাঙনই বাড়ায় না, এটি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও জীববৈচিত্র্যকেও ধ্বংস করে। মাছের প্রজনন ব্যাহত হয়, পানির গুণগত মান নষ্ট হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে পুরো ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবেলায় সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি-
অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান ও নজরদারি
নদী ব্যবস্থাপনায় বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা
দুর্নীতি রোধে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
নদীতীর সংরক্ষণে টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়ন
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা
পরিকল্পিত ও উপযুক্ত বাঁধ নির্মাণে স্বস্তি আসে নদী তীরের জনজীবনে
নদী বাংলাদেশের প্রাণ, কিন্তু সেই নদীই যখন মানুষের জীবন কেড়ে নেয়, তখন তা শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং একটি নীতিগত ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা না গেলে, নদীভাঙন আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। আর তার মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।
বাংলাদেশের নদীগুলোকে বাঁচাতে হলে এখনই কঠোর সিদ্ধান্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই।