এক সময় শিশুর শৈশব মানেই ছিল উঠোনে দৌড়ঝাঁপ, সমবয়সীদের সঙ্গে ঝগড়া-মীমাংসা, গল্প করা, দল বেঁধে খেলা। আজ সেই শৈশব ক্রমেই সরে যাচ্ছে টাচস্ক্রিনের ভেতরে। স্মার্টফোন, ট্যাব বা ল্যাপটপ, স্ক্রিন এখন অনেক শিশুর প্রথম খেলনা, প্রথম শিক্ষক এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রথম ‘বন্ধু’।
প্রশ্ন হলো, এই স্ক্রিন-কেন্দ্রিক শৈশব শিশুর সামাজিক বিকাশকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে?
সামাজিক বিকাশ বলতে শুধু কথা বলা বা ভদ্র আচরণ শেখাকে বোঝায় না। এর ভেতরে রয়েছে-
অন্যের অনুভূতি বোঝার ক্ষমতা (Empathy)
দলগত আচরণ ও সহযোগিতা
মতবিরোধ সামলানো
আত্মপরিচয় ও আত্মসম্মান গড়ে ওঠা
শৈশবেই এসব গুণের ভিত্তি তৈরি হয়। কিন্তু এই বিকাশ সবচেয়ে ভালোভাবে ঘটে মুখোমুখি মানবিক যোগাযোগের মাধ্যমে, যেখানে চোখের ভাষা, শরীরী ভঙ্গি, অপেক্ষা করা, পালা করে কথা বলা, সবকিছুই শেখার অংশ।
বর্তমান সময়ে অনেক শিশু-
খাবার খায় ভিডিও দেখে
ঘুমায় কার্টুন চালু রেখে
অবসর কাটায় গেম বা সোশ্যাল মিডিয়ায়
ফলে বাস্তব মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সময় ও সুযোগ দুটোই কমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুর সামাজিক দক্ষতা বিকাশে একটি নীরব প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
স্ক্রিন শিশুকে শব্দ শেখাতে পারে, কিন্তু সংলাপ শেখাতে পারে না।
ভিডিও একমুখী যোগাযোগ শিশু দেখে, শোনে; কিন্তু নিজের ভাব প্রকাশ, প্রশ্ন করা বা অন্যের কথার প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সুযোগ পায় না। এর ফল হিসেবে দেখা যাচ্ছে-
দেরিতে কথা বলা
বাক্য গঠনে দুর্বলতা
বাস্তব কথোপকথনে অস্বস্তি
বিশেষ করে যেসব শিশু খুব অল্প বয়সেই দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে অভ্যস্ত হয়, তাদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।
মানুষের আবেগ বোঝা শেখা হয় মুখোমুখি মিথস্ক্রিয়ায় কারও কণ্ঠের ওঠানামা, মুখভঙ্গি, চোখের চাহনি থেকে। কিন্তু স্ক্রিনে এসব অনুভূতি হয় ফিল্টার করা, অতিরঞ্জিত বা কৃত্রিম।
ফলে স্ক্রিনে বড় হওয়া অনেক শিশুর মধ্যে-
অন্যের কষ্ট বা আনন্দ বোঝার ক্ষমতা কমে
বাস্তব সামাজিক পরিস্থিতিতে সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় না
সহমর্মিতার জায়গায় উদাসীনতা দেখা দেয়
আপাতদৃষ্টিতে স্ক্রিন শিশুদের “সংযুক্ত” রাখছে মনে হলেও, বাস্তবে অনেক শিশু ভেতরে ভেতরে একা হয়ে পড়ছে। ভার্চুয়াল গেম বা ভিডিওতে শিশুর চারপাশ ঘোরে নিজেকে কেন্দ্র করে।
সে জয়ী হবে, সে স্কোর করবে, সে পরের লেভেলে যাবে।
এই অভ্যাস দীর্ঘদিন চললে-
দলগত মানসিকতা দুর্বল হয়
বাস্তব বন্ধুত্ব গড়তে কষ্ট হয়
সামাজিক পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা কমে
স্ক্রিন শিশুকে দেয় তাৎক্ষণিক আনন্দ ও দ্রুত উত্তেজনা। ফলে বাস্তব জীবনের ধীর গতি শিশুর কাছে বিরক্তিকর মনে হতে পারে। এর প্রভাব হিসেবে দেখা যায়-
অপেক্ষা করতে না পারা
সহজে রেগে যাওয়া
নিয়ম মানতে অনীহা
এসব আচরণ স্কুল ও পরিবার, দুটো জায়গাতেই সামাজিক সমস্যার জন্ম দেয়।
না। স্ক্রিন নিজেই শত্রু নয়; সমস্যা হলো অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। সঠিক বয়সে, সীমিত সময়ের জন্য, মানসম্মত কনটেন্ট শিশুর শেখার সহায়ক হতে পারে। কিন্তু স্ক্রিন কখনোই বাস্তব সামাজিক অভিজ্ঞতার বিকল্প হতে পারে না।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিচ্ছেন-
বয়সভিত্তিক স্ক্রিন টাইম নির্ধারণে
স্ক্রিনের পাশাপাশি খেলাধুলা ও পারিবারিক সময় নিশ্চিত করতে
শিশুর সঙ্গে কথা বলা, গল্প করা, একসঙ্গে কাজ করার অভ্যাসে
শিশু কী দেখছে, কতক্ষণ দেখছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো শিশু কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে।
স্ক্রিনে বড় হওয়া শিশুরা প্রযুক্তিতে দক্ষ হতে পারে, কিন্তু সামাজিকভাবে দক্ষ না হলে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ভবিষ্যৎ সমাজের জন্য প্রয়োজন এমন প্রজন্ম, যারা শুধু স্মার্ট নয়, সংবেদনশীল, সহানুভূতিশীল ও সামাজিকভাবেও পরিণত।
শৈশব যদি স্ক্রিনের ভেতরেই আটকে যায়, তবে মানবিক সম্পর্ক শেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টাই হারিয়ে যায়। তাই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে সহায়ক হিসেবে, শৈশবের বিকল্প হিসেবে নয়।