লাইফস্টাইল

ভালো থাকার চাপ: ‘হ্যাপি থাকতে হবে’ ধারণাটাই ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে

সুখের নামে আধুনিক জীবনের এক নীরব মানসিক সহিংসতা

নিজস্ব প্রতিবেদক

“ভালো থাকো”, “পজিটিভ থাকো”, “সব ঠিক হয়ে যাবে”- এই বাক্যগুলো এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে প্রচলিত আশ্বাস। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। আধুনিক সমাজে মানুষ যত বেশি ‘ভালো থাকার’ অভিনয় করছে, তত বেশি সে ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত, বিভ্রান্ত ও একা হয়ে পড়ছে। সুখকে এখন আর অনুভূতি হিসেবে দেখা হয় না; এটি হয়ে উঠেছে একটি সামাজিক বাধ্যবাধকতা। আর এই বাধ্যবাধকতার চাপই আজ মানুষের মানসিক সুস্থতার সবচেয়ে বড় শত্রু।

সুখ কি সব সময় সম্ভব, নাকি এটি একটি অবাস্তব প্রত্যাশা?

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় সুখ (happiness) একটি অস্থায়ী আবেগ, কোনো স্থায়ী অবস্থা নয়। মানুষের আবেগের পরিসরে দুঃখ, হতাশা, রাগ, ভয়, সবই স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। কিন্তু আধুনিক সমাজ সুখকে এমনভাবে উপস্থাপন করছে যেন দুঃখ মানেই ব্যর্থতা, দুর্বলতা বা অযোগ্যতা।

এই ভুল ধারণা থেকেই জন্ম নেয় toxic positivity, অর্থাৎ যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে ভালো দেখাতে বাধ্য করা, কষ্টকে অস্বীকার করা এবং নেতিবাচক আবেগকে দমন করা।

‘সব ঠিক আছে’, এই মিথ্যার মনস্তাত্ত্বিক মূল্য

একজন মানুষ যখন দীর্ঘদিন নিজের প্রকৃত অনুভূতি লুকিয়ে রাখে, তখন তার মানসিক ব্যবস্থায় তিনটি মারাত্মক পরিবর্তন ঘটে-

Emotional Suppression

অনুভূতি চেপে রাখলে তা হারিয়ে যায় না; বরং অবচেতন মনে জমা হতে থাকে। পরে তা উদ্বেগ, অবসাদ, অনিদ্রা বা শারীরিক সমস্যার মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

Self-alienation (নিজের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা)

মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতেই পারে না, সে আসলে কী অনুভব করছে। নিজের আবেগের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলে।

Guilt Complex

“আমার তো সব ঠিক থাকার কথা, তবু আমি কেন ভালো নেই?”- এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় অপরাধবোধ।

সোশ্যাল মিডিয়া: সুখের প্রদর্শনী, কষ্টের গোপনীয়তা

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো সুখকে করেছে পারফরম্যান্স। হাসিমুখ, সাফল্য, ভ্রমণ, সম্পর্ক- সবই প্রদর্শনের বিষয়। কিন্তু মানুষের কষ্ট, দ্বিধা, ভাঙন, সেগুলো অদৃশ্য।

মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় social comparison stress।

মানুষ অবচেতনে নিজের ভাঙাচোরা বাস্তবতাকে অন্যের সাজানো জীবনের সঙ্গে তুলনা করে এবং নিজেকে ব্যর্থ মনে করে।

কেন আমরা কষ্ট প্রকাশ করতে ভয় পাই?

বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় সমাজে-

  • কষ্ট মানে দুর্বলতা

  • কান্না মানে অক্ষমতা

  • সাহায্য চাওয়া মানে ব্যর্থতা

এই সামাজিক শিক্ষাই মানুষকে আবেগগতভাবে নীরব করে তোলে। ফলে মানুষ হাসে বেশি, বলে কম।

‘ভালো থাকার চাপ’ থেকে কীভাবে জন্ম নেয় দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সমস্যা

একজন সাইকোলজি বিশেষজ্ঞ হিসেবে দেখা যায়-

দীর্ঘদিন কষ্ট অস্বীকার করলে Generalized Anxiety Disorder

নিজের অনুভূতিকে অবমূল্যায়ন করলে Depressive Symptoms

সবকিছু সামলানোর অভিনয়ে Burnout Syndrome

এসব সমস্যা হঠাৎ আসে না। এগুলো আসে “আমি ঠিক আছি” বলার অভ্যাস থেকে।

মানসিকভাবে সুস্থ থাকা মানে সবসময় ভালো থাকা নয়

মনোবিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো-

👉 Healthy mind allows all emotions.

সুস্থ মানুষ সে নয় যে কখনো ভাঙে না, বরং সে-

  • ভাঙলে তা স্বীকার করতে পারে

  • সাহায্য চাইতে ভয় পায় না

  • নিজের আবেগকে বিচার না করে গ্রহণ করতে শেখে

তাহলে বিকল্প কী?

১. সুখকে লক্ষ্য নয়, অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখুন

আজ ভালো না থাকাও জীবনের অংশ- এটি ব্যর্থতা নয়।

২. নিজের আবেগকে ভাষা দিন

“আমি ক্লান্ত”, “আমি ভেঙে পড়েছি”, এই বাক্যগুলো নিজেকে বলার সাহস তৈরি করুন।

৩. পজিটিভিটির নামে আবেগ দমন বন্ধ করুন

সব কিছুর ভালো দিক খোঁজার প্রয়োজন নেই। কিছু কষ্ট শুধু কষ্টই।

৪. নিরাপদ জায়গা তৈরি করুন

একজন মানুষ, একটি ডায়েরি বা একজন পেশাদার- যেখানে আপনি অভিনয় ছাড়া থাকতে পারেন।

উপসংহার

ভালো থাকার চাপ আসলে আধুনিক জীবনের সবচেয়ে নিষ্ঠুর মানসিক দাবি। এটি মানুষকে সুখী করে না; বরং মানুষকে নিজের কাছ থেকেই দূরে সরিয়ে দেয়।

মনস্তাত্ত্বিকভাবে সুস্থ জীবন মানে নিখুঁত সুখ নয়, বরং সত্যিকারের অনুভূতির জায়গা তৈরি করা।

সব সময় ভালো থাকতে হবে না।

কখনো কখনো ঠিক না থাকাটাই সবচেয়ে মানবিক।