রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো, ক্ষমতা কোথায় কেন্দ্রীভূত থাকবে এবং কোথায় বিকেন্দ্রীভূত হবে। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্থানীয় সরকারকে শুধু সেবা প্রদানের বাহন নয়, বরং গণতন্ত্রের প্রথম সিঁড়ি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় শাসন ও স্থানীয় সরকারের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই অসম।
যেখানে নীতিগতভাবে বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলা হলেও কার্যত ক্ষমতা কেন্দ্রে আটকে থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি অনিবার্য, কেন্দ্রীয় শাসন বনাম স্থানীয় সরকার: ক্ষমতার ভারসাম্য ঠিক কোথায় এবং কেন ভাঙছে?
গণতন্ত্রের তত্ত্ব অনুযায়ী স্থানীয় সরকার-
নাগরিকের নিকটতম শাসনব্যবস্থা
স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্ল্যাটফর্ম
নেতৃত্ব বিকাশের প্রাথমিক ক্ষেত্র
কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষাকারী
বিকেন্দ্রীকরণ মানে কেন্দ্র দুর্বল করা নয়; বরং রাষ্ট্রকে কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক করা।
বাংলাদেশের সংবিধান স্থানীয় সরকারের কথা স্বীকার করে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন, এই কাঠামো বিদ্যমান।
কিন্তু বাস্তবে-
নীতিনির্ধারণে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা সীমিত
আর্থিক ক্ষমতা দুর্বল
প্রশাসনিক কর্তৃত্ব কেন্দ্রনির্ভর
ফলে স্থানীয় সরকার অধিকাংশ সময় কার্যকর শাসক নয়, বরং বাস্তবায়নকারী ইউনিটে পরিণত হয়।
ক্ষমতার ভারসাম্য ভাঙার সবচেয়ে বড় কারণ অর্থনীতি।
স্থানীয় সরকারের নিজস্ব রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা সীমিত
কেন্দ্রীয় বরাদ্দের ওপর অতিনির্ভরতা
প্রকল্প অনুমোদনে মন্ত্রণালয় নির্ভরতা
ফলে স্থানীয় সরকার রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত হলেও অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন নয়। অর্থ যেখানে নেই, ক্ষমতাও সেখানে টেকসই হয় না।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ভেতরে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব কাজ করে-
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি
কেন্দ্র থেকে নিযুক্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা
বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে-
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা
জেলা প্রশাসক
লাইন ডিপার্টমেন্ট
এই প্রশাসনিক কাঠামোই সিদ্ধান্তের গতি ও সীমা নির্ধারণ করে। নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়ে পড়েন আনুষ্ঠানিক মুখ, ক্ষমতার প্রকৃত কেন্দ্র নয়।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো অত্যন্ত কেন্দ্রনির্ভর।
মনোনয়ন কেন্দ্র থেকে নির্ধারিত
স্থানীয় নেতৃত্বের স্বায়ত্তশাসন সীমিত
দলীয় শৃঙ্খলার নামে স্থানীয় মত দমন
ফলে স্থানীয় সরকার অনেক সময় স্থানীয় নয়, কেন্দ্রীয় রাজনীতির উপশাখা হয়ে ওঠে।
উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে দেখা যায়-
জাতীয় পরিকল্পনা স্থানীয় বাস্তবতাকে ছাপিয়ে যায়
প্রকল্পের ধরন নির্ধারিত হয় কেন্দ্রীয়ভাবে
স্থানীয় অংশগ্রহণ সীমিত
ফলে উন্নয়ন হয় দৃশ্যমান, কিন্তু সবসময় প্রয়োজনভিত্তিক নয়। এতে স্থানীয় সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ও সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কেন্দ্রীয় শাসনের একটি যুক্তি হলো-
স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা ও স্বচ্ছতার ঘাটতি
দুর্নীতির ঝুঁকি
এই সমালোচনা পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হলো- সক্ষমতা না দিলে, ক্ষমতা না দিলে, সক্ষমতা তৈরি হবে কীভাবে?
দুর্বলতা দূর করার পথ নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং প্রশিক্ষণ, নজরদারি ও জবাবদিহি।
স্থানীয় সরকার দুর্বল হলে-
নাগরিক অংশগ্রহণ কমে
স্থানীয় সমস্যা জাতীয় রাজনীতিতে হারিয়ে যায়
মানুষ রাষ্ট্রকে দূরের ও অচেনা মনে করে
ফলে গণতন্ত্র থাকে কাগজে, জীবনে নয়।
বিশ্বের বহু দেশে-
স্থানীয় সরকার নিজস্ব রাজস্ব তোলে
স্থানীয় পুলিশ ও সেবা ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখে
নীতিনির্ধারণে কেন্দ্রের সঙ্গে সমান অংশীদার
বাংলাদেশে এই মডেল অচিন্তনীয় নয়, কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া অসম্ভব।
ক্ষমতার ভারসাম্য ভাঙছে মূলত চার জায়গায়-
অর্থনৈতিক নির্ভরতায়
প্রশাসনিক কর্তৃত্বে
রাজনৈতিক কেন্দ্রায়নে
নীতি নির্ধারণে স্থানীয় কণ্ঠের অনুপস্থিতিতে
সমাধান কোনো এক পক্ষকে দুর্বল করার মাধ্যমে নয়। প্রয়োজন-
স্থানীয় সরকারের আর্থিক ক্ষমতায়ন
প্রশাসনিক ও নির্বাচিত নেতৃত্বের স্পষ্ট দায়িত্ব বিভাজন
দলীয় রাজনীতিতে বিকেন্দ্রীকরণ
স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা জোরদার
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি মৌলিক সিদ্ধান্তের ওপর-
আমরা কি সবকিছু কেন্দ্র থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই, নাকি জনগণের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে চাই?
ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা বলে,
শক্তিশালী কেন্দ্র দিয়ে রাষ্ট্র চালানো যায়,
কিন্তু টেকসই গণতন্ত্র গড়া যায় কেবল শক্তিশালী স্থানীয় সরকার দিয়ে।
ক্ষমতার ভারসাম্য তাই ভাঙার নয়- পুনর্গঠনের প্রশ্ন।