আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই হবে দেশের প্রথম নির্বাচন।
এই নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট সংসদের আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ নিবন্ধিত ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করে জাতীয় সংসদের ৩৫০ জন সদস্য নির্বাচন করবেন।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে। ওই আন্দোলনের পর থেকে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছে।
আন্দোলন দমনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দিয়ে প্রায় ১,৪০০ বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার ঘটনায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে গঠিত একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। তবে তিনি বর্তমানে ভারতে নির্বাসনে রয়েছেন। তার দল আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ নিয়ে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ছাত্র আন্দোলনের পর প্রণীত এই নথিকে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে দুটি বড় রাজনৈতিক জোটের মধ্যে-
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন ১০-দলীয় জোট
জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট, যার অংশ ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)
দীর্ঘদিন বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী থাকা আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে প্রার্থী দিতে পারছে না।
এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, যারা জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট থেকে বেরিয়ে এসেছে, এবং জাতীয় পার্টি, যারা একসময় আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল, এই দুই দল স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।
বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র। আসন্ন নির্বাচনে দলটিকে অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। দলটির মূল আদর্শ ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’, যা দলটির ভাষায়, জাতি, লিঙ্গ বা বর্ণ নির্বিশেষে সব বাংলাদেশির অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়।
কেন্দ্র-ডানপন্থী রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি কয়েক দশক ধরে দেশের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে এবং ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে পালাক্রমে ক্ষমতায় এসেছে।
১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর প্রায় চার দশক দলটির নেতৃত্ব দেন তার স্ত্রী খালেদা জিয়া। তিনি ১৯৯১–৯৬ এবং ২০০১–০৬ মেয়াদে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ওই সময় জামায়াতে ইসলামী ছিল বিএনপির রাজনৈতিক মিত্র।
২০০৯ সালে শেখ হাসিনা পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগের মুখে পড়ে। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দি করা হয়। তবে ২০২৪ সালে হাসিনার পতনের পর তিনি সব অভিযোগ থেকে খালাস পান।
২০২৪ সালের পর থেকে বিএনপি আবারও রাজনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থানে ফিরে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি জরিপে দেখা যায়, ৩৩ শতাংশ ভোটারের সমর্থন রয়েছে বিএনপির পক্ষে। একই সময়ে দলটি নির্বাচনের আগে নিজেকে তুলনামূলক উদার রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে গিয়ে জামায়াতের সঙ্গে জোট ভেঙেছিল।
৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান ২০০৮ সালে রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ তুলে যুক্তরাজ্যে চলে যান। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি ঢাকায় ফিরে বিএনপির নেতৃত্ব নেন। তার পাঁচ দিন পরই তার মা খালেদা জিয়া মারা যান।
বাংলাদেশে ফিরে তারেক রহমান বলেন,
“একজন মা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন, আমরা সেই বাংলাদেশ গড়ব।”
নির্বাচনী জনসভায় তিনি অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যখাত সংস্কার, নদীভাঙন রোধ ও তরুণদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ানের মতে, তারেক রহমান ফেরার পর বিএনপি সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়েছে। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলটি নতুন উদ্যমে সক্রিয়, এবং নেতাদের বক্তব্যেও আগের তুলনায় সতর্কতা দেখা যাচ্ছে।
১৯৪১ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা করেন সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটি পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় স্বাধীনতার পর এটি নিষিদ্ধ হয়। তবে ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন।
পরবর্তী দুই দশকে জামায়াত একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয় এবং ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটকে সমর্থন দেয়।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলে জামায়াতের পাঁচ শীর্ষ নেতা যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ড পান, অনেকে কারাবন্দি হন। ২০১৩ সালে দলটিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখা হয়।
২০২৫ সালের জুনে সুপ্রিম কোর্ট জামায়াতের নিবন্ধন পুনর্বহাল করলে দলটি আবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়।
বর্তমান নেতা শফিকুর রহমান নির্বাচনে দলকে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গড়ে তুলতে সংগঠন পুনর্গঠনে জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচন হবে “একটি মোড় ঘোরানো নির্বাচন”।
তবে জামায়াতের উত্থান নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, দলটি ক্ষমতায় গেলে নারীর অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতায় কড়াকড়ি আসতে পারে। জামায়াত এসব আশঙ্কা প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এগোতে চায়।
প্রথমবারের মতো দলটি খুলনা থেকে একজন হিন্দু প্রার্থী দিয়েছে, সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের উদ্যোগে এনসিপি গঠিত হয়।
দলের নেতা নাহিদ ইসলাম (২৭)। দলটির ঘোষিত লক্ষ্য- দুর্নীতিমুক্ত শাসন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন।
তবে পর্যাপ্ত অর্থ ও সংগঠনের অভাবে দলটি এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পেরে জামায়াতের সঙ্গে জোট গড়ে। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে দলটির ভেতরে মতবিরোধ দেখা দেয় এবং কয়েকজন নেতা পদত্যাগ করেন।
নির্বাচনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী না হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস এবং সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এই নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
ইউনুস নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে গণভোট আয়োজনের দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলো সনদের পক্ষে ঐকমত্যে পৌঁছাবে।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের সময় নিরাপত্তা রক্ষা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা সেনাবাহিনীর বড় দায়িত্ব।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি সফল নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ইউনুসের প্রশাসনিক ভূমিকা এবং সেনাবাহিনীর অবস্থান, দুটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা এই নির্বাচনকে অবৈধ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার বক্তব্য,
“বহিষ্কারের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া সরকার বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে না।”
বাংলাদেশ সরকার ভারতে তাকে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। যদিও আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নিষিদ্ধ, বিশ্লেষকদের মতে দলটির সমর্থকগোষ্ঠী এখনো বড় একটি বাস্তবতা।
একাডেমিক খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ানের মতে, আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার প্রভাব পুরোপুরি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই, এ কারণেই অন্তর্বর্তী সরকার তার বক্তব্য প্রচারে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।