ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
এর ঠিক দু’দিন আগেই বাংলাদেশ একটি রাজনৈতিক মোড়ের সামনে দাঁড়িয়ে। শুধু প্রার্থীর সংখ্যা বা ভোটার রেজিস্ট্রি নয়, এই ভোটের ফল দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র, পারস্পরিক শক্তির ভারসাম্য, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং নাগরিকের আসল আত্মবিশ্বাস পর্যন্ত পুনর্গঠন করতে পারে।
এই নির্বাচনের পর শুধু একটি সরকার তৈরি হবে না, বরঞ্চ একটি রাজনৈতিক অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের ধারাবাহিকতা তৈরি হবে। এবারকার ভোটটিকে ত্রয়োদশ নির্বাচন হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং এক প্রসঙ্গভিত্তিক সংকট, সমাধান ও নতুন সূচনার অংশ হিসেবে।
আগের বহু নির্বাচনের মতো ২০২৬–এর ভোটও শুধু অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে-
২০২৪ এর ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলন যে সরকারের পতন ঘটিয়েছে এবং এখন একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আছে।যা রাজনৈতিক পুনর্গঠনের ভিত্তি তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক বাহ্যিক শক্তিগুলোর দৃষ্টি দক্ষিণ এশিয়া/ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত অগ্রাধিকার পেয়ে গেছে, এ পরিস্থিতি নির্বাচনকে এক ধরনের আঞ্চলিক সিগনিফিকেন্সও দিয়েছে।
এই ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ডে নির্বাচন একটি গভীরতম রাজনৈতিক পরিমাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৬ সালের নির্বাচনকে আগের অনেক নির্বাচনের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্পষ্টতা ও বহুমাত্রিকতা। এবার ভোটের মাঠে প্রতিযোগিতা কেবল আনুষ্ঠানিক উপস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শক্তি, সংগঠন, জনসমর্থন এবং রাজনৈতিক অবস্থানের বাস্তব সংঘর্ষ দৃশ্যমান।
বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট প্রায় সব আসনেই সক্রিয়ভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। বিভিন্ন জরিপ ও মাঠপর্যায়ের বিশ্লেষণে ইঙ্গিত মিলছে- এই জোট উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে এবং ভোটের ফলাফলে বড় অংশীদার হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘদিন পর একটি বিস্তৃত ও সংগঠিত নির্বাচনমুখী কাঠামোতে বিএনপির উপস্থিতি ভোটের রাজনীতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটও একই সঙ্গে একটি দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। কিছু জরিপে দেখা যাচ্ছে, নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে এই জোটের ভোটভিত্তি বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিযোগিতায় রয়েছে, এমনকি কোথাও কোথাও সামান্য ব্যবধানে এগিয়েও আছে। ফলে নির্বাচনটি কেবল একক আধিপত্যের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং সমান্তরাল শক্তির ভারসাম্য তৈরি করছে।
অন্যদিকে,
এনসিপি- এর মতো তুলনামূলক নতুন ও ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও উপেক্ষণীয় নয়। এরা তরুণ ভোটারদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও অংশগ্রহণকে সংগঠিত ভোটব্যাংকে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে।
যদিও এই দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামো ও দেশব্যাপী শক্তি এখনও সীমিত, তবুও তারা রাজনৈতিক বয়ানে নতুন প্রশ্ন ও নতুন ভাষা যোগ করছে, যা ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের নির্বাচনকে কেবল দু’টি জোটের ক্ষমতার লড়াই হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যকার একটি রূপান্তরমুখী প্রতিযোগিতা।
ভোটের ফলাফল শুধু সংসদের আসন বণ্টন নির্ধারণ করবে না; বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস, জোটভিত্তিক রাজনীতির গতি এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের কাঠামোও স্পষ্ট করে দেবে।
এ নির্বাচনের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- ভোটার প্রত্যাশা ঠিক কী?
অনেক ভোটার মনে করে এটি শুধু সরকারের পরিবর্তনের ভোট নয়; বরং-
রাজনৈতিক স্বাধীনতার পুনরুদ্ধার
সংগঠিত নাগরিক অংশগ্রহণের সুযোগ
দীর্ঘস্মৃতি নির্যাতনের পর ন্যায্য ক্ষমতা চাওয়া
তরুণদের রাজনৈতিক দাবি
এই সব আবেগ এবং বাস্তব প্রত্যাশা নির্বাচনকে সাধারণ ভোটের হালচাল থেকে এক ধাপ উপরে নিয়ে গিয়েছে।
তবে একইসঙ্গে কিছু অংশ অবিশ্বাস, সংশয় ও প্রশ্ন নিয়ে ভোটের দিকে চাইছে—জৈথনিকভাবে মনে হচ্ছে ভোট তো হচ্ছে, কিন্তু তা কি পরিবর্তন আনবে? এটি একটি বড় রাজনৈতিক ভাবনা।
নির্বাচনযাত্রা শুরু হওয়া সত্ত্বেও-
সরকার প্রায় ১ মিলিয়ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করেছে ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করতে।
নির্বাচন কমিশন বলছে কোনো বড় উদ্বেগ বা গুরত্বপূর্ণ উদ্বেগ নেই এবং ভোট “নিরাপদ ও ন্যায়সঙ্গত” করার আশ্বাস দিচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলো ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা ভোট প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ/গড়ার অভিযোগ তুলছে, বিশেষত 'বিএনপি' তদনুসারে ভোটপেপার বা ধর্মীয় আবেগের অপব্যবহারের ভয় প্রকাশ করছে।
এই সব মিলিয়ে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ দেখালেও বহুমাত্রিক রাজনৈতিক চাপ, সন্দেহ ও প্রতিযোগিতার অন্তর্নিহিত প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি বলেছে-
কোনো বড় উদ্বেগ নেই এবং নির্বাচন মেনে নেওয়া যায় এমন পরিবেশে হবে
মনিটারিং ও তদন্ত ব্যবস্থা সক্রিয়
সম্ভবত নির্বাচনকালীন আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে তদন্ত চলছে
এই ধরণের ঘোষণায় কমিশন বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, কিন্তু রাজনীতি ও সমাজের ভিন্ন মতও প্রকাশিত হচ্ছে।
একদিকে নির্বাচন আইন ও কারিগরি ব্যবস্থা আছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক পক্ষের অপব্যাখ্যার অভিযোগ আছে। এই দ্বৈত বাস্তবতা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উপর চাপ তৈরি করছে।
এই নির্বাচনের সবচেয়ে গভীর প্রশ্নটি হলো-
এটা কি শুধু একটি ভোট, নাকি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে পুনর্নির্মাণ করার একটি সুযোগ?
প্রার্থীরা বলছেন এ ভোট মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ফেরানোর একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।
অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির ভিত্তিতে নির্বাচন ‘গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদ’ বাড়াতে পারে। অথবা, তা কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতায় কিছু অংশ স্থিতিশীলতার টুল হিসাবেও ব্যবহৃত হতে পারে। যেখানে বিরোধিতার অংশগ্রহণ, নতুন রাজনৈতিক গঠন, এবং জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবে দেখা যেতে পারে।
নির্বাচনের ফল শুধু সংসদীয় গণতন্ত্র নয়,
এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে-
রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনর্গঠন
বিরোধী রাজনীতির শক্তি ও স্বীকৃতি
তরুণ ভোটারদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ
আঞ্চলিক কূটনীতি (যেমন ভারত ও চীনের ভূমিকাও পরিবর্তিত হতে পারে)
সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার
এই নির্বাচন একটি ‘কৌশলগত সন্ধিক্ষণ’। এটির ফল আগামী কয়েক বছর রাজনীতির নতুন মানচিত্র আঁকবে।
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬–এর ভোট একটি সাধারণ নির্বাচনের মতো নয়; এটি-
গণতন্ত্রের পুনর্নির্মাণের পরীক্ষা
রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন মাত্রা
অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক শক্তির মানসিকতা
স্থিতিশীলতা বনাম পরিবর্তনের মধ্যকার ভারসাম্য
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মুহূর্ত
এই নির্বাচন শুধু সংসদ গঠনের ভোট নয়, এটি রাজনৈতিক সংকট সমাধানের একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান, জনসম্মত পুনর্বিন্যাস এবং গণতান্ত্রিক বাস্তবতার পুনরুজ্জীবন।