২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের শেখ হাসিনার 'স্বৈরাচারী' সরকার পতনের পর—প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। সেই অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশত্যাগে বাধ্য হন। হাসিনার দেড় দশকের টানা শাসন অবসানের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে গেছে, আর সেই পরিবর্তিত বাস্তবতায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই নির্বাচন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বৃহস্পতিবারের ভোটকে ঘিরে সারাদেশে ১ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তাদের সহায়তায় থাকছে প্রায় ১ লাখ সেনাসদস্য এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরও হাজারো সদস্য। প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার এবার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন।
নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে, ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান।
বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীদের চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে ১১ দলীয় একটি জোট, যার নেতৃত্বে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। শেখ হাসিনার আমলে নিষিদ্ধ থাকা ইসলামপন্থী দলটি—তার পতনের পর থেকে জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা জোরদার করেছে। এই জোটে আরও রয়েছে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের উদ্যোগে গঠিত নতুন দল-জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি রাষ্ট্র-সংস্কার সংক্রান্ত একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রস্তাবিত সংস্কারের মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ, নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং সংসদীয় ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য ঠেকাতে সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়নসহ নানান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সহিংসতার ঝুঁকি
মঙ্গলবার আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ জানান, দেশের ২৯৯টি আসনের ৯০ শতাংশেরও বেশি ভোটকেন্দ্র সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। মোট ৩০০ আসনের মধ্যে একটি আসনে একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোটগ্রহণ স্থগিত রাখা হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম মঙ্গলবার জানিয়েছেন, দেশের ৪২ হাজার ভোটকেন্দ্রের অর্ধেকেরও বেশি কেন্দ্রকে সহিংসতার ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ৭৭০টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৬ হাজার কেন্দ্রকে মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, কিছু কেন্দ্র অত্যন্ত প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত। যেখানে নির্বাচনের প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বৈরিতা বিরাজ করছে। তিনি আরও জানান, ২০২৪ সালের অস্থিরতার সময় লুট হওয়া পুলিশের ১,৩০০ অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি।
গতকাল পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের মিডিয়া সেন্টারে 'জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি' বিষয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব তথ্য জানান।
আইজিপি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে পুলিশের পক্ষ থেকে বডি-অর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী জেলা পুলিশ সুপাররা ড্রোন ক্যামেরার সহায়তা নেবেন।
তিনি আরও বলেন, এবারের নির্বাচনকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নিরাপদ নির্বাচন হিসেবে আয়োজন করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। নির্বাচন উপলক্ষে সারা দেশে প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ সদস্য, প্রায় ৬ লাখ আনসার সদস্য, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং প্রায় ১ লাখ সেনাবাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে।
তফসিল ঘোষণার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে কিছু সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে জানিয়ে আইজিপি বলেন, "আমাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১১ ডিসেম্বর থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ৩১৭টি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হয়েছেন ৬০৩ জন এবং নিহত হয়েছেন ৫ জন।"
বাংলাদেশের একটি মানবাধিকার সংগঠন—আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৫৮ জন নিহত এবং ৭ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি অভিযোগ করেছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এসময়ে 'মব' সৃষ্টি করে সড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছে।
পুলিশের আইজিপি বলেন, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে পুলিশ বদ্ধপরিকর। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, তার বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থার ঘাটতি এখনো রয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষ কেন পুলিশকে বিশ্বাস করে না, তা বোঝা যায়। গত ১৫ বছরে আমরা যা করেছি—আসলে গত দেড়শ বছর ধরেই আমাদের পূর্বসূরিরা মূলত মানুষকে পিটিয়েছে।
নিজ নিজ এলাকায় ফিরছেন লাখো মানুষ
নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন উপলক্ষে তিন দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। যা গতকাল মঙ্গলবার থেকেই শুরু হয়েছে।
ভোটের দিন গণপরিবহন চলাচলে বিধিনিষেধ থাকায় হাজার হাজার মানুষ—বিশেষ করে কারখানার শ্রমিকরা—নিজ নিজ এলাকায় ভোট দিতে ফিরতে শুরু করেছেন।
কর্মসূত্রে রাজধানী ঢাকায় থাকেন তাবিশ মাহদী। তিনি রংপুর জেলার একটি গ্রামে নিবন্ধিত ভোটার। তিনি জানান, বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও সেদিন তিনি বাসের টিকিট পাননি।
বার্তাসংস্থা আনাদোলু-কে তিনি বলেন, "মনে হচ্ছে মানুষ এই নির্বাচন নিয়ে ভীষণ উৎসাহী। শেখ হাসিনার শাসনামলে আগের নির্বাচনগুলোয় আমরা ভোট দিতে পারিনি। তাই এবার সবাই ভোট দিতে চায়।"
নির্বাচনকে ঘিরে বাড়তি চাপের কারণে গতকাল ঢাকার সাথে দেশের অন্যান্য অঞ্চলকে সংযোগকারী কয়েকটি মহাসড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয় বলে স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।
প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটারের মধ্যে এক-চতুর্থাংশই প্রথমবারের মতো ভোট দিচ্ছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশই এই নতুন ভোটারদের মধ্যে রয়েছেন। তারা দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতির পরিবর্তন দেখতে চান।
ফলে জনমনে প্রত্যাশা তুঙ্গে যে, দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে বিতর্কিত নির্বাচন ও সঙ্কুচিত রাজনৈতিক পরিসরের পর এই ভোট গণতান্ত্রিক চর্চাকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন পুরো রূপান্তর প্রক্রিয়া তদারকি করছে এবং একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশ্বাস দিয়েছে।
মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে টেলিভিশন ভাষণে অধ্যাপক ইউনূস নাগরিকদের ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ভয়কে পেছনে রেখে, সাহসকে সামনে এনে ভোটকেন্দ্রে যান। আপনার একটি ভোট শুধু একটি সরকার নির্বাচন করবে না; এটি ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে, বাধাহীন ফ্যাসিবাদের জবাব দেবে।
গত ১৭ বছর ধরে যারা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন, সেই তরুণ ও নারী ভোটারদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়ে ড. ইউনূস বলেন, "আপনারা বড় হয়েছেন এমন এক বাস্তবতায়, যেখানে ভোটের মুখোশ ছিল কিন্তু ভোট ছিল না। আজ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথ বদলানোর দিন এসেছে।"