জাতীয়

প্রচার শুরুর আগেই উত্তপ্ত রাজনৈতিক অঙ্গন, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় দলগুলোর অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচার শুরু হওয়ার আগেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে একের পর এক অভিযোগ তুলছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)। বড় দলগুলোর দাবি, প্রার্থী ও প্রচারণা সংক্রান্ত নিয়ম প্রয়োগে কমিশন ও মাঠ প্রশাসন পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে।

গত এক সপ্তাহে নির্বাচন কমিশন, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক এবং বিভিন্ন জনসমাবেশে দলগুলোর শীর্ষ নেতারা এসব অভিযোগ প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন। আগামী বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, এর আগেই অভিযোগ–পাল্টা অভিযোগে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

প্রধান উপদেষ্টার আশ্বাস

গতকাল এনসিপি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন,

“নির্বাচন সম্পর্কিত যেকোনো অভিযোগ ও পরামর্শ তাৎক্ষণিকভাবে সরকারকে জানাবেন। সরকারের পক্ষ থেকে যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সরকার তা নেবে। কেউ যেন আইন অমান্য করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তিনি আরও বলেন,

“নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার জন্যই লটারির মাধ্যমে মাঠ প্রশাসনে রদবদল করা হয়েছে। এ নির্বাচনে কোনো পক্ষপাতিত্বের সুযোগ নেই। এটি দেশের ভাগ্য নির্ধারণের নির্বাচন, এবং এই নির্বাচন সুষ্ঠু হতেই হবে।”

ইসির ভেতরেও চাপের কথা স্বীকার

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নির্বাচন কমিশনের দুইজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর ধারাবাহিক অভিযোগ ও বিক্ষোভের কারণে কমিশন বাস্তবেই চাপের মুখে রয়েছে। এমনকি অভ্যন্তরীণ পোস্টাল ভোটিংয়ের ব্যালটেও সংশোধন আনতে হয়েছে।

এক কর্মকর্তা বলেন,

“প্রচারণার সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।”

এ অবস্থায় পোস্টাল ব্যালটে ভোটের পদ্ধতি ও সার্বিক ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে আজ মঙ্গলবার সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসছে নির্বাচন কমিশন।

বিএনপির অভিযোগ: পক্ষপাত ও গোপনীয়তা লঙ্ঘন

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন,

“কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, একটি রাজনৈতিক দল চাপ সৃষ্টি করলে নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়ছে বলে মনে হয়। আমরা চাই কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে যেন কোনো প্রশ্ন না ওঠে।”

এর আগে আগারগাঁওয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা আচরণবিধি ভঙ্গ করে প্রচারণা চালাচ্ছেন এবং মাঠ প্রশাসনের একটি অংশ একটি দলের পক্ষে কাজ করছে।

তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অমীমাংসিত বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।

এছাড়া ফখরুল অভিযোগ করেন, জামায়াতের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনআইডির কপি, বিকাশ নম্বর ও ফোন নম্বর সংগ্রহ করছে, যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

জামায়াতের পাল্টা অভিযোগ

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন,

“নির্বাচন কমিশনের ভেতরে কিছু কর্মকর্তা একটি নির্দিষ্ট দলের দিকে ঝুঁকে আছেন বলে মনে হচ্ছে।”

জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের দাবি করেন, মাঠপর্যায়ের কিছু ডিসি ও এসপির আচরণ পক্ষপাতদুষ্ট এবং একটি দলের প্রধানকে বিশেষ নিরাপত্তা ও প্রটোকল দেওয়া হলেও জামায়াতের আমিরকে তা দেওয়া হয়নি।

তিনি বিএনপির বিরুদ্ধে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগও তোলেন।

এনসিপির অভিযোগ: সমান সুযোগ নেই

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের আচরণ নিয়ে উদ্বেগ জানান। বৈঠক শেষে দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন,

“আগের বিতর্কিত নির্বাচনের মতো একই কায়দায় মাঠ প্রশাসনের ক্ষেত্রে কমিশনের একতরফা আচরণ কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে।”

তিনি দাবি করেন, প্রচারণা নিষিদ্ধ থাকাকালেও একটি দলের পোস্টারে ঢাকা শহর ছেয়ে গিয়েছিল, অথচ তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আবদুল আলীম ও জেসমিন টুলি বলেন, কমিশনের উচিত নির্দিষ্ট অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করা এবং জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে ফল প্রকাশ করা।

আবদুল আলীম বলেন,

“ভোটের আগে রাজনৈতিক চাপ তৈরির জন্য পক্ষপাতের অভিযোগ একটি কৌশল হলেও, এবারের মতো সমন্বিত চাপ আগে দেখা যায়নি।”

তার মতে, দুই দিনের মধ্যে প্রচারণা শুরু হওয়ার আগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে।

ইসির বক্তব্য

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন,

“পক্ষপাতের অভিযোগ রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। নির্বাচন কমিশন কারো প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট নয়। আমরা অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”