জাতীয়

জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন: রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের ঝুঁকি দেখছে আর্টিকেল ১৯

নিজস্ব প্রতিবেদক

অন্তর্বর্তী সরকার মেয়াদের শেষ সময়ে জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন ও সম্প্রচার কমিশন গঠনে আকস্মিক খসড়া অধ্যাদেশ প্রকাশ করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আর্টিকেল ১৯।

৩ ফেব্রুয়ারি দেওয়া এক বিবৃতিতে আর্টিকেল ১৯ জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ মুহূর্তে নেওয়া এই আকস্মিক উদ্যোগ স্বচ্ছতা ও যথাযথ প্রক্রিয়ার অভাবকে স্পষ্ট করে তোলে। এতে বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ারও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, খসড়া জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশের লক্ষ্য একটি জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা হয়েছে। কিন্তু এর কাঠামো, মর্যাদা, কমিশনারদের দায়িত্ব এবং প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণ স্পষ্ট। এছাড়াও প্রবল আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্বের প্রভাব দেখা যায়।

এ ধরনের কাঠামো কমিশনটিকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকিতে ফেলবে। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।

বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের (আইসিসিপিআর) ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হতে হয়। কিন্তু এই খসড়ায় তা প্রতিফলিত হয়নি।

কাঠামোগত স্বাধীনতার প্রশ্ন ছাড়াও অধ্যাদেশটিতে আরও বেশ কিছু ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছে আর্টিকেল ১৯।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘সাংবাদিক’-এর সংজ্ঞা থেকে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের বাদ দেওয়া।

সংস্থাটি জানায়, এর ফলে গণমাধ্যমকর্মীদের একটি বড় অংশ আইনি সুরক্ষা, স্বীকৃতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাইরে পড়ে যাবে, যা ইতোমধ্যেই নাজুক গণমাধ্যম পরিবেশকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।

প্রস্তাবিত সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশে বহুত্ববাদ বা জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতা সুরক্ষার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে জানায় সংস্থাটি।

আর্টিকেল ১৯ আরও জানায়, বাংলাদেশ গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের ২২ মার্চ তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। এর প্রায় এক বছর পর তড়িঘড়ি করে এই অধ্যাদেশ দেওয়া হয়েছ। যদিও ওই প্রতিবেদনে জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন গঠনের সুপারিশ ছিল।

সংস্থাটির দাবি, অন্তর্বর্তী সরকার এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো অর্থবহ পদক্ষেপ নেয়নি। সংস্কার কমিশনের সদস্যরাও এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে হতাশা প্রকাশ করেছেন।

কয়েক মাসের নিষ্ক্রিয়তার পর সরকারের এই আকস্মিক তৎপরতা উদ্দেশ্য ও বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন নির্বাচিত সরকার গঠনের প্রক্রিয়া সামনে রেখে আর্টিকেল ১৯ অন্তর্বর্তী সরকারকে অবিলম্বে এসব অধ্যাদেশ প্রণয়নের প্রক্রিয়া বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।

সংস্থাটি বলেছে, এ ধরনের সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটসহ নবনির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সরকারকে খসড়া অধ্যাদেশগুলো থেকে বিরত থাকতে হবে এবং সব সিদ্ধান্ত পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য মুলতবি রাখতে হবে।

একইসঙ্গে সাংবাদিক, সম্পাদক, নাগরিক সমাজ ও আইন বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে একটি স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরামর্শ প্রক্রিয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া ভবিষ্যতের যেকোনো গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত ও সম্পূর্ণ স্বাধীন রাখার নিশ্চয়তা দেওয়ার সঙ্গে সব সংস্কার সামঞ্জস্যপূর্ণ করার দাবি জানিয়েছে আর্টিকেল ১৯।

নির্বাচনকালীন সময়ে সব সাংবাদিকের নিরাপত্তা ও অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাটি।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আর্টিকেল ১৯ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করে। ১৯৮৭ সালে যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মুক্ত চিন্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। সংস্থাটি ২০০৮ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় কার্যক্রম শুরু করে।