ভারতীয় গণমাধ্যম, হিন্দুস্তান টাইমস- এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক সময়ে সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া বক্তব্যের ইস্যু। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রথম প্রকাশ্য বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের আগে এ ধরনের বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সরকার।
রোববার এক প্রতিক্রিয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার সতর্ক করে বলেছে, দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যতের জন্য একটি “বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত” তৈরি করেছে।
শুক্রবার ভারত থেকে দেওয়া প্রথম প্রকাশ্য ভাষণে শেখ হাসিনা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘অযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এই সরকার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে ব্যর্থ। তিনি জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
একই সঙ্গে ইউনূস-নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে সহিংসতা, নির্যাতন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং নারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা প্রশ্রয়ের গুরুতর অভিযোগ তোলেন শেখ হাসিনা।
ভারতে শেখ হাসিনাকে জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি দেওয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। ঢাকায় রোববার জারি করা এক বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দিল্লিতে একটি জনসমাবেশে শেখ হাসিনাকে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ “বিস্মিত ও মর্মাহত”।
রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে বলা হয়, “এ ধরনের বক্তব্য বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রক্রিয়া, শান্তি ও নিরাপত্তাকে স্পষ্টভাবে হুমকির মুখে ফেলছে।”
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরও দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী ভারত এখনো তাকে বাংলাদেশে হস্তান্তর করেনি।
বিবৃতিতে বলা হয়, “বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও ভারত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের বিষয়ে তার দায়বদ্ধতা পালন করেনি; বরং তাকে নিজ ভূখণ্ড থেকে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে, এতে বাংলাদেশ গভীরভাবে ক্ষুব্ধ।”
নয়াদিল্লিতে ওই অনুষ্ঠান আয়োজন ও শেখ হাসিনার বক্তব্যকে ‘ঘৃণাত্মক ভাষণ’ হিসেবে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, এটি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি এবং সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের পরিপন্থী।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “এটি বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যতের জন্য একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে এবং ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকারের পক্ষে ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক কল্যাণমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।”
এতে আরও বলা হয়, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের উসকানিমূলক বক্তব্যই প্রমাণ করে কেন অন্তর্বর্তী সরকার দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনের দিন সহিংসতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করা হবে এবং এসব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
ঢাকা ছাড়ার পর ভারতে দেওয়া প্রথম প্রকাশ্য ভাষণে শেখ হাসিনা তার বক্তব্যের বড় অংশজুড়ে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে আক্রমণ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ইউনূস চরমপন্থী সাম্প্রদায়িক শক্তি ও বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের তথাকথিত হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছেন।
তিনি ইউনূসকে “ফ্যাসিবাদী, সুদখোর, অর্থপাচারকারী, লুটেরা ও ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক” আখ্যা দিয়ে বলেন, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ “সন্ত্রাসের যুগে” প্রবেশ করেছে।
শেখ হাসিনা দাবি করেন, ২০২৪ সালের আগস্টে একটি “পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের” মাধ্যমে তার সরকার উৎখাত করা হয়েছে, যদিও এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
তার ভাষায়, “গণতন্ত্র এখন নির্বাসনে। মানবাধিকার ধূলিসাৎ হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বিলুপ্ত। নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও যৌন নিপীড়ন অব্যাহত রয়েছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নিরবচ্ছিন্ন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে।”
তিনি জাতিসংঘের মাধ্যমে সাম্প্রতিক ঘটনাবলির একটি “নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত” দাবি করেন এবং সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার জন্য জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
প্রাক-রেকর্ড করা একটি অডিও বার্তার মাধ্যমে দিল্লির ওই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার করা হয়। উল্লেখ্য, বক্তব্যের একদিন আগেই বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়। নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ায় আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
সূত্র- হিন্দুস্তান টাইমস