জাতীয়

সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ—আসন্ন নির্বাচন ও আগামীর পথচলা

নিজস্ব প্রতিবেদক

২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সংস্কার এবং দীর্ঘ ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের পর বাংলাদেশ এখন তার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিনে 'জুলাই সনদ' বা রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা নিয়ে অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় গণভোট। এই জোড়া নির্বাচন কেবল নতুন সরকার গঠন নয়, বরং আগামীর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভাগ্য নির্ধারণ করবে।

রাজনৈতিক সমীকরণ ও নির্বাচনী ময়দান

দীর্ঘ দেড় দশক পর এবারের নির্বাচনে বড় ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তির একটি, আওয়ামী লীগ, আইনি জটিলতা ও নিষেধাজ্ঞার কারণে এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। ফলে নির্বাচনী মাঠের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে সীমিত হলেও, নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত 'জাতীয় নাগরিক পার্টি' (NCP) ও তরুণ প্রজন্মের সমর্থনপুষ্ট দলগুলো বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার আশায় থাকলেও জামায়াত ও অন্যান্য ছোট দলগুলোর জোটবদ্ধ অবস্থান সংসদের চেহারা পাল্টে দিতে পারে।

সংস্কার বনাম নির্বাচনের লড়াই

এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো 'জুলাই সনদ' নিয়ে গণভোট। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যে রাষ্ট্র সংস্কারের (বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ প্রশাসন) উদ্যোগ নিয়েছে, জনগণ কি তাতে পূর্ণ সম্মতি দেবে? নাকি দ্রুত রাজনৈতিক শাসনের প্রত্যাশায় কেবল ভোটের দিকেই মনোযোগ দেবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ভোটাধিকার প্রয়োগে প্রবাসীদের জন্য প্রথমবারের মতো 'পোস্টাল ব্যালট' ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যা প্রায় ১৫ লাখ ভোটারকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত করেছে।

অর্থনীতি ও রাজনীতির নতুন মেরুকরণ

অর্থনৈতিক অগ্নিপরীক্ষা: নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিন

নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভঙ্গুর অর্থনীতিকে ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর:

* মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা এবং মুদ্রানীতিতে আমূল পরিবর্তন আনা অপরিহার্য হয়ে পড়বে।

* বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিয়োগ: রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে থমকে যাওয়া সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) ফিরিয়ে আনা এবং প্রবাসী আয়ের (Remittance) বৈধ চ্যানেল শক্তিশালী করা হবে নতুন অর্থমন্ত্রীর প্রধান কাজ।

* ব্যাংকিং খাত সংস্কার: গত কয়েক বছরে ব্যাংকিং খাতে যে অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে একটি শক্তিশালী 'ব্যাংকিং কমিশন' গঠন এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায়, তারল্য সংকট অর্থনীতিকে আরও স্থবির করে দিতে পারে।

রাজনৈতিক দলগুলোর পরিবর্তিত ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ

এবারের নির্বাচনে দলগুলোর কৌশল ও অবস্থানের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে:

* বিএনপি-র জন্য অস্তিত্বের লড়াই: দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি-র কাছে এটি কেবল ক্ষমতায় ফেরার নির্বাচন নয়, বরং নিজেদের একটি দায়িত্বশীল ও গণতান্ত্রিক দল হিসেবে প্রমাণের সুযোগ। তৃণমূল পর্যায়ে দখলদারিত্ব বা চাঁদাবাজির যে অভিযোগ উঠেছে, তা কঠোরভাবে দমন করতে না পারলে দলটি জনসমর্থন হারানোর ঝুঁকিতে থাকবে।

* নতুন শক্তির উত্থান (Third Force): ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা নতুন রাজনৈতিক দলগুলো এবং নাগরিক সমাজ এবার 'কিংমেকার' হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। তারা মূলত 'ব্যালেন্স অফ পাওয়ার' হিসেবে কাজ করবে, যা সংসদে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

* জামায়াতে ইসলামীর কৌশল: এবারের নির্বাচনে জামায়াত নিজেদের একটি উদারপন্থী এবং জনকল্যাণমুখী দল হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। সংসদের ভেতরে তাদের আসন সংখ্যা বাড়লে তারা জাতীয় নীতি নির্ধারণে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও ভোটারদের অগ্রাধিকার

নির্বাচনী প্রচারণায় রাজনীতির চেয়েও বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে অর্থনীতি। ভোটারদের বড় অংশই তরুণ, যাদের প্রধান দাবি—কর্মসংস্থান। গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতি এবং বেকারত্ব যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে আগামীর সরকারের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বিদেশি বিনিয়োগ ফিরিয়ে আনা। দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির মতো পুরনো অভিশাপগুলো নতুন মোড়কে ফিরে আসা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক চাপ ও ভূ-রাজনীতি

বাংলাদেশের এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছে সারাবিশ্ব। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো আন্তর্জাতিক অংশীদাররা একটি 'অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অবাধ' নির্বাচনের ওপর জোর দিচ্ছে। নির্বাচনের পর নতুন সরকার বিশ্বমঞ্চে কতটা গ্রহণযোগ্যতা পায়, তার ওপর নির্ভর করবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ ও বিদেশি সাহায্যের প্রবাহ।

আগামী বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি অনেকাংশেই নির্ভর করবে বিশ্বশক্তির সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার ওপর। ভারত, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নতুন সরকারের সম্পর্ক কেমন হবে, তা দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং রপ্তানি বাণিজ্যের (বিশেষ করে জিএসপি প্লাস সুবিধা) জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উপসংহার: আগামীর পথচলা, বাংলাদেশ কোন দিকে?

২০২৬ সালের এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো 'রিবুট' করার একটি সুযোগ। যদি রাজনৈতিক দলগুলো পরমতসহিষ্ণুতা বজায় রাখতে পারে এবং সংস্কারগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়, তবে বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল অর্থনীতির দিকে এগোবে। অন্যথায়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পুনরাবৃত্তি ঘটলে উন্নয়ন থমকে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।

আসন্ন এই নির্বাচন বাংলাদেশকে দুটি পথের একটিতে নিয়ে যেতে পারে। প্রথমত, একটি সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সূচনা। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার অভাব থাকলে পুনরায় অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকটের ঝুঁকি।

সাধারণ মানুষ এখন কেবল ভোট দিতেই নয়, বরং এমন একটি 'নতুন বাংলাদেশ' দেখতে চায় যেখানে ক্ষমতার দাপট নয়, বরং আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। ১২ ফেব্রুয়ারির রায়ই বলে দেবে বাংলাদেশ কি একটি টেকসই গণতন্ত্রের পথে হাঁটবে, নাকি পুরনো বৃত্তেই ঘুরপাক খাবে।