জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র চাবুকে বিশ্ব আজ এক অভূতপূর্ব পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি। এই সংকটের অন্যতম দুটি নীরব কিন্তু বিধ্বংসী রূপ হলো খরা ও মরুকরণ।
প্রতি বছর ১৭ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস’ (World Day to Combat Desertification and Drought)। ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে ঘোষণার পর থেকে প্রতি বছরই এর প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৬ সালের এই জুনের তপ্ত বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে দিবসটি বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ, কৃষিপ্রধান এবং ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশের জন্য কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার এক চরম সতর্কবার্তা।
মরুকরণ বলতে আমরা অনেকেই কেবল ধু-ধু সাহারা মরুভূমির মতো কোনো চিত্রকে কল্পনা করি, কিন্তু বাস্তুবিদ্যা বা পরিবেশ বিজ্ঞানের ভাষায় মরুকরণ হলো শুষ্ক, অর্ধ-শুষ্ক এবং উপ-আর্দ্র অঞ্চলের ভূমির গুণগত মান, পুষ্টি ও উৎপাদন ক্ষমতা ক্রমাগত হ্রাস পাওয়া। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এবং নির্বিচারে বৃক্ষনিধনের ফলে আজ বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ ভূমি মরুকরণের তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে।
২০২৬ সালের বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য, ‘ভূমির অধিকার ও ভবিষ্যৎ: খরা মোকাবিলায় নারীর নেতৃত্ব ও সম্মিলিত প্রয়াস’, আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভূমির স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতার ওপরই মানব সভ্যতার খাদ্য নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব নির্ভর করছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশের খরা পরিস্থিতি
প্রকৃতি ও জলবায়ুর এই ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশকে ঐতিহাসিকভাবে নদীমাতৃক এবং আর্দ্র জলবায়ুর দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, বাস্তব চিত্রটি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন ও আশঙ্কাজনক। গলোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র এলাকা (রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর) এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ অববাহিকা প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদী খরার সম্মুখীন হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাতের চিরচেনা ধরণ এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। অসময়ে অতিবৃষ্টি ও বন্যার প্রকোপ যেমন বাড়ছে, ঠিক তেমনি যথাসময়ে অনাবৃষ্টির কারণে কৃষি খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
খরার কারণে মাটির উপরিভাগের স্বাভাবিক আর্দ্রতা ও জৈব উপাদান শুকিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে ফসলের ফলন আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। এর চেয়েও বড় বিপর্যয় ঘটছে মাটির নিচে; কৃষি ও গৃহস্থালির প্রয়োজনে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর প্রতি বছর কয়েক ফুট করে নিচে নেমে যাচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে এক সময় যেখানে মাটির নিচে অল্প গভীরতায় সুপেয় পানি পাওয়া যেত, এখন সেখানে গভীর নলকূপ বা ডিপ-টিউবওয়েল দিয়েও পানি তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, যা ওই অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতিকে এক চরম শুষ্কতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মরুকরণ ও খরা প্রবণতার নেপথ্য কারণ
বাংলাদেশে মরুকরণ ও খরা প্রবণতা বৃদ্ধির নেপথ্য কারণগুলো অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, প্রাকৃতিক নিয়ামকের চেয়ে মানুষের তৈরি বা মানবসৃষ্ট কারণগুলোই এখানে সিংহভাগ দায়ী। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হলো বোরো চাষের জন্য নির্বিচারে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা। শুষ্ক মৌসুমে নদী-নালা শুকিয়ে যাওয়ার কারণে কৃষকেরা বাধ্য হয়ে মাটির গভীর থেকে পানি তুলছেন, যা মাটির নিচের একুইফার বা পানির আধারগুলোকে শূন্য করে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি রয়েছে আন্তর্জাতিক নদী অববাহিকার আমূল পরিবর্তন।
বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত অভিন্ন নদীগুলোর উজানে প্রতিবেশী দেশগুলোর বাঁধ নির্মাণ এবং শুষ্ক মৌসুমে একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে দেশের প্রধান প্রধান নদ-নদীগুলো তাদের চিরচেনা নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে। পদ্মা, তিস্তা, মহানন্দার মতো বিশাল নদীগুলো আজ শুষ্ক মৌসুমে বালুচরে পরিণত হচ্ছে। নদী শুকিয়ে যাওয়ার কারণে আশেপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ভূমির পানির স্তর আরও নিচে নেমে যাচ্ছে এবং মাটির আর্দ্রতা উধাও হয়ে যাচ্ছে। নদীভাঙন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দূষণ এবং জমিতে রাসায়নিক সারের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে মাটির উর্বরা শক্তি এবং পানি ধারণ ক্ষমতা স্থায়ীভাবে নষ্ট হচ্ছে।
এর সাথে যোগ হয়েছে বনভূমি ধ্বংসের মহোৎসব; জলবায়ুর ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য কোনো দেশের মোট আয়তনের অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশে তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম, যা আঞ্চলিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনাবৃষ্টির অন্যতম কারণ।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের চিত্র
এই খরা ও মরুকরণের বহুমাত্রিক প্রভাব কেবল পরিবেশ বা ভূগোলের মানচিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিণতি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং মারাত্মক। বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ, যেখানে এখনো কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা সরাসরি মাটির উর্বরতার ওপর নির্ভরশীল।
খরা মানেই কৃষকের ফসলহানি, আর ফসলহানি গ্রামীণ অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেয়, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব গিয়ে পড়ে জাতীয় জিডিপিতে (GDP)। খরার কারণে যখন চারণভূমি শুকিয়ে যায়, তখন গবাদিপশুর খাদ্য সংকট তৈরি হয়, যা দুগ্ধ ও মাংস উৎপাদনে বিপর্যয় আনে। এর চেয়েও বড় সামাজিক সংকট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে 'জলবায়ু শরণার্থী' বা ক্লাইমেট রিফিউজিস।
উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের প্রান্তিক মানুষ ও কৃষকেরা যখন খরা এবং তীব্র পানির সংকটের কারণে জমিতে চাষাবাদ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন, তখন তারা জীবিকার তাগিদে দলে দলে আদিভিটা ছেড়ে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম বা অন্যান্য বড় শহরের দিকে পাড়ি জমাচ্ছেন। এতে নগরগুলোর ওপর জনসংখ্যার চাপ, বস্তির সংখ্যা এবং সামাজিক অপরাধের প্রবণতা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, যা সামগ্রিক সামাজিক ভারসাম্যকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করছে।
অন্যদিকে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে খরা ও নদী শুকিয়ে যাওয়ার ফলে সমুদ্রের লোনা পানি ভেতরের দিকে চলে আসছে, যা সুপেয় পানির তীব্র সংকট তৈরি করছে এবং নারীদের দূর-দূরান্ত থেকে খাবার পানি সংগ্রহের এক নতুন মানবিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
সংকট উত্তরণে বহুমুখী টেকসই পদক্ষেপ
এই আসন্ন পরিবেশগত বিপর্যয় ও মরুভূমিরূপী আগ্রাসন থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে আমাদের এখনই চিরাচরিত ধারণার বাইরে এসে 'টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা' এবং দীর্ঘমেয়াদী পানি পরিকল্পনার দিকে হাঁটতে হবে।
প্রথমত, আমাদের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর থেকে নির্ভরশীলতা দ্রুত কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ বা সারফেস ওয়াটারের ব্যবহার বাড়াতে হবে। বর্ষা মৌসুমের অতিরিক্ত পানি ধরে রাখার জন্য দেশের মৃতপ্রায় নদী, খাল-বিল, দীঘি এবং হাওরগুলোকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ড্রেজিং বা খনন করে পানি সংরক্ষণের বিশাল আধার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পরিবর্তিত জলবায়ুর সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীদের খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল ধান, গম ও অন্যান্য শস্যের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও গবেষণা আরও বাড়াতে হবে, যাতে অত্যন্ত কম পানিতেও কৃষকেরা ভালো ফলন ঘরে তুলতে পারেন।
তৃতীয়ত, বরেন্দ্র অঞ্চলসহ দেশের সমস্ত খরাপ্রবণ এলাকায় ব্যাপকভাবে সামাজিক বনায়নের আওতায় খরাসহিষ্ণু ও গভীরমূলী গাছ (যেমন নিম, বাবলা, খেজুর, অর্জন) রোপণ করতে হবে, যা মাটির ক্ষয়রোধ করবে এবং প্রস্বেদনের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতা ফিরিয়ে আনবে।
চতুর্থত, সনাতন সেচ পদ্ধতির কারণে যে বিপুল পরিমাণ পানির অপচয় হয়, তা রোধে ড্রিপ ইরিগেশন বা ফোঁটা ফোঁটা সেচ পদ্ধতির মতো আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে এবং কৃষকদের এতে ভর্তুকি প্রদান করতে হবে।
সর্বোপরি, অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে কার্যকর পানি কূটনীতি জোরদার করতে হবে।
ভবিষ্যৎ অঙ্গীকার:
ভূমি কোনো সীমাহীন বা নবায়নযোগ্য সম্পদ নয়; একবার যদি মাটির প্রাণ বা উর্বরতা শক্তি হারিয়ে যায়, তবে তা পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব। আমরা যদি আজ মাটির যত্ন না নিই, তবে আগামী প্রজন্মকে এক ধূসর, অনুৎপাদক, কর্কশ ও ক্ষুধার্ত পৃথিবীর মুখোমুখি হতে হবে।
২০২৬ সালের এই বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবসে আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার হওয়া উচিত, প্রকৃতিকে অবজ্ঞা করে বা ধ্বংস করে কোনো তথাকথিত উন্নয়ন নয়, বরং প্রকৃতির সাথে গভীর মেলবন্ধন ও টেকসই পরিকল্পনা তৈরি করে ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। সরকার, পরিবেশবাদী সংগঠন, গণমাধ্যম এবং সাধারণ জনগণ, সবাইকে একসাথে কাঁধ মিলিয়ে ভূমির অবক্ষয় রোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি গাছ কাটা মানে মরুকরণকে এক কদম স্বাগত জানানো, আর একটি গাছ লাগানো ও মাটির যত্ন নেওয়া মানে মরুকরণকে এক কদম পিছিয়ে দেওয়া।
আসুন, সম্মিলিত ও দূরদর্শী প্রচেষ্টায় আমাদের এই সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা রূপসী বাংলাকে মরুভূমি হওয়া থেকে রক্ষা করি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ ও নিরাপদ পৃথিবী রেখে যাই।