শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক- এর ৬৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আমাদের সামনে কেবল একটি ঐতিহাসিক স্মরণ নয়, বরং একটি কঠিন প্রশ্নও তুলে ধরে। আমরা কি তাঁর আদর্শকে বাস্তবে ধারণ করছি, নাকি শুধু প্রতীকীভাবে ব্যবহার করছি?
ইতিহাসের এই মহীরুহকে বুঝতে হলে শুধু তাঁর কর্ম নয়, তাঁর চিন্তার ভিত্তি- ‘গণমুখী রাজনীতি’, কে নতুন করে বিশ্লেষণ করতে হয়। কারণ তাঁর রাজনীতি ছিল রাষ্ট্র ও ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের জীবনযাপন থেকে উৎসারিত।
বরিশালের মাটি থেকে উঠে আসা এই নেতা ব্রিটিশ ভারতের উচ্চশিক্ষিত আইনজীবী হয়েও এলিট রাজনীতির অংশ হয়ে থাকেননি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়- এ শিক্ষালাভ তাঁকে আধুনিক রাজনৈতিক বোধ দিয়েছে, কিন্তু তাঁর অবস্থান ছিল গ্রামীণ বাস্তবতায়।
এখানেই তাঁর অনন্যতা, তিনি ‘জনগণের প্রতিনিধি’ ছিলেন না, বরং ‘জনগণের অংশ’ ছিলেন।
এই জায়গাটিই আজকের বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি অনুপস্থিত। আমাদের রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্ব আছে, কিন্তু সংযুক্তি নেই। শেরে বাংলার রাজনীতির কেন্দ্র ছিল মানুষের দৈনন্দিন সংকট- খাদ্য, ভূমি, শিক্ষা, যেখানে আজকের আলোচনায় প্রায়শই ক্ষমতার অঙ্ক প্রাধান্য পায়।
‘কৃষক প্রজা পার্টি’ গঠনের মাধ্যমে তিনি কৃষক শ্রেণিকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেন। যা ছিল এক ধরনের ‘গ্রাসরুটস পলিটিক্স’। ১৯৪০ সালের, ‘লাহোর প্রস্তাব’ তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রমাণ, যদিও এর ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ প্রয়োজন, ফজলুল হকের রাজনীতি ছিল নিখুঁত আদর্শবাদী নয়; বরং বাস্তববাদী। তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী জোট করেছেন, আপস করেছেন, কিন্তু মূল লক্ষ্য- ‘জনগণের স্বার্থ’ থেকে পুরোপুরি সরে যাননি। বর্তমান রাজনীতিতে আপস আছে, কিন্তু আদর্শের ধারাবাহিকতা প্রায়শই অনুপস্থিত।
এই উপাধি কেবল তাঁর সাহসিকতার জন্য নয়; বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ধারাবাহিকতার জন্য।
জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে অবস্থান এবং কৃষকের পক্ষে নীতি গ্রহণ তাঁকে সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক করে তোলে। আজকের প্রেক্ষাপটে ‘সাহসী রাজনীতি’ বলতে আমরা প্রায়শই কেবল বক্তৃতার তীব্রতা বুঝি, কিন্তু শেরে বাংলার ক্ষেত্রে সাহস ছিল নীতিনির্ধারণে। যেখানে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গিয়ে প্রান্তিকদের পক্ষে দাঁড়াতে হয়।
রাষ্ট্র ও সমাজে তাঁর নাম ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত- প্রতিষ্ঠান, সড়ক, রাজনৈতিক বক্তব্যে। কিন্তু নীতিনির্ধারণে তাঁর মূল দর্শন- অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে?
এখানে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যায়। একদিকে তাঁর নামের প্রচার, অন্যদিকে তাঁর নীতির অনুপস্থিতি। ফলে ‘চেতনা’ একটি প্রতীকী শব্দে পরিণত হয়েছে, যার বাস্তব প্রয়োগ সীমিত।
বর্তমান প্রজন্মের বড় একটি অংশ তাঁর অবদান সম্পর্কে আংশিক বা পৃষ্ঠতল জ্ঞান রাখে। ইতিহাসকে পরীক্ষাভিত্তিক জ্ঞান হিসেবে উপস্থাপন করার ফলে এর সঙ্গে মানসিক সংযোগ তৈরি হচ্ছে না।
এই বিচ্ছিন্নতা দীর্ঘমেয়াদে একটি মূল্যবোধের সংকট তৈরি করে। কারণ ইতিহাস শুধু অতীত নয়, এটি ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। শেরে বাংলার মতো নেতার চিন্তা যদি নতুন প্রজন্মের মধ্যে অনুপস্থিত থাকে, তবে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও তার প্রভাব পড়বে।
- শেরে বাংলার রাজনীতির তিনটি মূল স্তম্ভ ছিল-
গণমুখিতা,
ন্যায়বিচার,
অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি।
এই তিনটি বিষয়কে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা ছাড়া তাঁর চেতনা ধারণ করা সম্ভব নয়।
এটি কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব নয়; বরং শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে।
প্রশ্নের মুখে বর্তমান: আমরা কি শুধু স্মরণ করছি, নাকি ধারণও করছি?
শেরে বাংলা ফজলুল হকের জীবন আমাদের শেখ্রছ- রাজনীতি তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনে।
তাঁর ৬৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি তাই রয়ে যায়- আমরা কি তাঁর নামকে স্মরণ করছি, নাকি তাঁর দর্শনকে অনুসরণ করছি?
যদি তা অনুসরণীয় না হয়, তবে আমাদের স্মরণ এখনো অসম্পূর্ণ।