মতামত

তারুণ্যের রাজনীতি, শক্তি নাকি সহজ শিকার?

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের রাজনীতিতে “তরুণ” শব্দটা খুব জনপ্রিয়। বক্তৃতায় তরুণ ভবিষ্যৎ, পোস্টারে তরুণ শক্তি, মিছিলে তরুণ ভিড়। কিন্তু বাস্তবে প্রশ্ন উঠলেই অস্বস্তি, এই তরুণরা কি রাজনীতির সিদ্ধান্তে আছে, নাকি শুধু প্রয়োজনে ব্যবহারযোগ্য একটি অংশ?

আজকের তরুণ সমাজ রাজনীতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়। তারা দেখে, বোঝে, আলোচনা করে। কিন্তু সেই সচেতনতা খুব কম ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে রূপ নেয়। কারণ রাজনীতির কাঠামোই এমনভাবে দাঁড়িয়েছে, যেখানে তরুণদের চিন্তাশীল নাগরিক নয়, বরং “কর্মক্ষম শরীর” হিসেবেই বেশি দরকার।

সাম্প্রতিক কিছু সহিংস ঘটনা আবারও সেই পুরোনো বাস্তবতাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে—সংঘাতের সামনে থাকে তরুণরাই। চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার কিংবা দলীয় দ্বন্দ্ব—এসব ঘটনায় যারা গ্রেপ্তার হয়, আহত হয় বা মারা যায়, তাদের বড় অংশ তরুণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সিদ্ধান্তগুলো কি তারা নেয়? নাকি সিদ্ধান্ত নেয় অন্য কেউ, আর মূল্য দেয় অন্যের সন্তান?

এখানেই রাজনৈতিক সচেতনতার ঘাটতি সবচেয়ে স্পষ্ট। তরুণদের শেখানো হচ্ছে আনুগত্য, শেখানো হচ্ছে লাইন মেনে চলা। প্রশ্ন করাটা ঝুঁকি, ভিন্নমত রাখা অপরাধ। ফলে রাজনীতি আর নৈতিকতার জায়গা থাকে না, হয়ে ওঠে শক্তি প্রদর্শনের মাঠ। সচেতনতা না থাকলে তরুণরা খুব সহজেই এই খেলায় পা দেয়, কারণ বিকল্প খুব কম।

আমরা প্রায়ই বলি তরুণরা দায়িত্বহীন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাদের দায়িত্বশীল হতে শেখানো হচ্ছে কই? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক শিক্ষা মানেই কি শুধু ছাত্ররাজনীতির ক্ষমতার লড়াই? নাকি গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার, ভিন্নমতের চর্চা শেখানোর কোনো উদ্যোগ আছে?

সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণরা অনেক কথা বলে, ক্ষোভ প্রকাশ করে। কিন্তু সচেতন রাজনীতি শুধু পোস্টে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। আবার রাস্তায় নামলেই রাজনীতিতে অংশগ্রহণ, এই ধারণাটাও ভুল। রাজনীতি মানে প্রশ্ন করা, না বলা, প্রয়োজনে সরে দাঁড়ানো, এই মানসিকতা ছাড়া তরুণরা বারবার ব্যবহৃতই হবে।

স্বশিক্ষিত হওয়ার প্রশ্নটা এখানেই আসে। আমরা কবে বুঝবো- রাজনীতি মানে শর্টকাট ক্ষমতা নয়? কবে তরুণরা নিজেকে কর্মী নয়, নাগরিক হিসেবে ভাববে? যতদিন তরুণরা নিজের অবস্থান নিজে নির্ধারণ করবে না, ততদিন কেউ না কেউ তাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর দায় এখানেও বড়। তরুণদের শুধু স্লোগানধারী বাহিনী হিসেবে দেখলে এই সংকট কাটবে না। আবার তরুণ সমাজকেও বুঝতে হবে, সব ডাকই নেতৃত্বের ডাক নয়, সব নির্দেশ মানাই দায়িত্ব নয়।

এই লেখা কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার বিরুদ্ধে নয়, কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক অভিযোগও নয়। এটা একটা সময়ের প্রশ্ন। তরুণ সমাজ কি রাজনীতিকে বদলাবে, নাকি রাজনীতি তরুণদের ব্যবহার করেই যাবে?

উত্তরটা খুব জটিল নয়।

রাজনীতি তরুণদেরই হবে- যেদিন তারা সচেতন হবে, স্বশিক্ষিত হবে, আর নিজের বিবেক অন্যের হাতে তুলে দেওয়া বন্ধ করবে।