মতামত

চরম আবহাওয়া ও বৈশ্বিক অর্থনীতি: জলবায়ু পরিবর্তন তৈরি করছে অর্থনৈতিক সংকট

বন্যা, তাপপ্রবাহ, খরা ও দাবানলের মতো প্রকৃতির আঘাতে নানা সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয় অবকাঠামো, যোগাযোগসহ নানান উপকরণ। যার কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয় বৈশ্বিক বাণিজ্য তথা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে যুদ্ধ, মহামারি, জ্বালানি সংকট ও আর্থিক মন্দাকে দীর্ঘদিন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে আরেকটি সংকট ক্রমশ অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে, জলবায়ু পরিবর্তন। একসময় এটি পরিবেশবিদদের উদ্বেগের বিষয় ছিল; এখন এটি অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকার, বিনিয়োগকারী, বীমা কোম্পানি, শিল্প উদ্যোক্তা এবং রাষ্ট্রপ্রধানদেরও অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়।

কারণ জলবায়ু পরিবর্তন আর কেবল ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমানের অর্থনৈতিক বাস্তবতা। বন্যা, তাপপ্রবাহ, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও দাবানলের মতো চরম আবহাওয়া এখন শুধু জীবন ও পরিবেশ নয়, উৎপাদন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, খাদ্য নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিকেও সরাসরি প্রভাবিত করছে।

প্রশ্ন হলো- জলবায়ু পরিবর্তন কি এখন পরিবেশগত সংকটের সীমা পেরিয়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে?

প্রকৃতির পরিবর্তন, অর্থনীতির অভিঘাত

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব হলো চরম আবহাওয়ার ঘটনা বৃদ্ধি। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে-

* দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ

* অস্বাভাবিক বন্যা

* ভয়াবহ খরা

* বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়

* ব্যাপক দাবানল

এসব ঘটনা আগে বিচ্ছিন্নভাবে ঘটলেও এখন সেগুলো আরও ঘনঘন, দীর্ঘস্থায়ী এবং ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।

অর্থনীতির ভাষায় এগুলো আর শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এগুলো “Economic shock” বা অর্থনৈতিক অভিঘাত।

উৎপাদনের ওপর সরাসরি আঘাত

বিশ্ব অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি হলো উৎপাদন। কিন্তু চরম আবহাওয়া সরাসরি সেই ভিত্তিকেই আঘাত করছে-

অতিরিক্ত তাপমাত্রা শিল্প কারখানার উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে। নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক এবং বাইরের পরিবেশে কাজ করা কোটি কোটি মানুষের কর্মঘণ্টা হ্রাস পাচ্ছে। অনেক অঞ্চলে গরমের কারণে দিনের নির্দিষ্ট সময় কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। খরা কৃষি উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে।

আবার বন্যা ও ঝড় কারখানা, গুদাম এবং পরিবহন অবকাঠামো ধ্বংস করছে।

অর্থাৎ, জলবায়ু পরিবর্তন এখন শ্রম, কৃষি ও শিল্প, তিনটি প্রধান উৎপাদন খাতকেই একযোগে প্রভাবিত করছে।

খাদ্য নিরাপত্তা থেকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি

জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক প্রভাব সবচেয়ে দ্রুত দেখা যায় খাদ্য খাতে।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে-

* গম উৎপাদনে তাপপ্রবাহের প্রভাব

* ধান চাষে খরা ও বন্যার প্রভাব

* ফল ও সবজির উৎপাদন হ্রাস

* পশুপালনে জলবায়ুগত চাপ

* ক্রমবর্ধমানভাবে খাদ্য সরবরাহকে অনিশ্চিত করে তুলছে।

ফলে, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে এবং মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা এখন “Climate Inflation” বা জলবায়ুজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ে আলোচনা করছেন- যেখানে খাদ্যের দাম কেবল বাজারগত কারণে নয়, বরং জলবায়ুগত কারণে বৃদ্ধি পায়।

সরবরাহ শৃঙ্খল: বৈশ্বিক বাণিজ্যের দুর্বলতা উন্মোচিত

কোভিড-১৯ মহামারি দেখিয়েছিল যে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা সংবেদনশীল। জলবায়ু পরিবর্তন সেই দুর্বলতাকে আরও প্রকট করছে-

* বন্যায় বন্দর অচল হয়ে যাচ্ছে।

* খরায় নদীপথ সংকুচিত হচ্ছে।

* দাবানলে রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে।

* ঘূর্ণিঝড়ে কনটেইনার পরিবহন থমকে যাচ্ছে।

বিশ্বায়নের যুগে একটি অঞ্চলের জলবায়ু বিপর্যয় অন্য অঞ্চলের শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি এবং বাজার সরবরাহকেও প্রভাবিত করছে।

ফলে, জলবায়ু ঝুঁকি এখন সরাসরি বৈশ্বিক বাণিজ্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

বীমা শিল্প: অদৃশ্য সংকটের কেন্দ্রবিন্দু

জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক অভিঘাত সবচেয়ে স্পষ্টভাবে অনুভব করছে বীমা খাত।

চরম আবহাওয়ার কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে।

বীমা কোম্পানিগুলোকে-

* বেশি ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছে

* ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল থেকে সরে যেতে হচ্ছে

* প্রিমিয়াম বাড়াতে হচ্ছে

ফলে অনেক জায়গায় বাড়ি, ব্যবসা বা কৃষি সম্পদের বীমা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, যখন কোনো ঝুঁকি বীমাযোগ্য থাকে না, তখন সেটি আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা থাকে না; বরং আর্থিক স্থিতিশীলতার সমস্যায় পরিণত হয়।

ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ খাতে নতুন ঝুঁকি

জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়; এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর আলোচ্য বিষয়ও।কারণ-

জলবায়ুজনিত ক্ষতি ঋণ খেলাপি বাড়াতে পারে

সম্পদের মূল্য কমিয়ে দিতে পারে

আর্থিক বাজারে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে

এ কারণে বিশ্বের বড় বড় ব্যাংক ও বিনিয়োগ তহবিল এখন জলবায়ু ঝুঁকিকে আর্থিক ঝুঁকি হিসেবে মূল্যায়ন করছে।

তাপপ্রবাহ: নীরব অর্থনৈতিক ঘাতক

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে অবমূল্যায়িত অর্থনৈতিক প্রভাব সম্ভবত তাপপ্রবাহ।

অতিরিক্ত গরম-

* শ্রম উৎপাদনশীলতা কমায়

* বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ায়

* স্বাস্থ্য ব্যয় বৃদ্ধি করে

* কর্মক্ষমতা হ্রাস করে

বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার অনেক অঞ্চল ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার বড় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

জলবায়ু অভিবাসন: নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, মরুকরণ, নদীভাঙন এবং কৃষি সংকট লক্ষ লক্ষ মানুষকে স্থানান্তরে বাধ্য করছে।

এই জলবায়ু অভিবাসন-

* নগরায়ণ বৃদ্ধি করছে

* সামাজিক অবকাঠামোর ওপর চাপ তৈরি করছে

* কর্মসংস্থান বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াচ্ছে

ফলে, এটি শুধু মানবিক নয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতেও পরিণত হচ্ছে।

জ্বালানি রূপান্তর: সংকটের মধ্যেই নতুন অর্থনীতি

তবে জলবায়ু সংকট শুধু ঝুঁকি নয়; এটি নতুন অর্থনৈতিক সুযোগও তৈরি করছে।

বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়ছে-

* সৌরশক্তি

* বায়ুশক্তি

* বৈদ্যুতিক যানবাহন

* সবুজ অবকাঠামো

* কার্বনমুক্ত প্রযুক্তি

অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় শিল্প বিপ্লবগুলোর একটি ঘটবে “Green Economy” বা সবুজ অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর দ্বৈত সংকট

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো- যেসব দেশ সবচেয়ে কম দূষণ করেছে, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ, নেপাল, আফ্রিকার বহু দেশ এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো- কম কার্বন নিঃসরণ করেছে।

কিন্তু বেশি জলবায়ু ঝুঁকি বহন করছে

ফলে তারা একই সঙ্গে উন্নয়ন ও অভিযোজন, দুই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি

জলবায়ু কূটনীতি ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন

এ কারণেই আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় এখন শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মূল বিতর্কগুলো হলো-

* ক্ষয়ক্ষতির দায় কার?

* অর্থায়ন কে দেবে?

* প্রযুক্তি কারা ভাগ করবে?

* অভিযোজন ব্যয় কে বহন করবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আগামী দশকের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে।

বিশ্ব অর্থনীতি কি নতুন ধরনের সংকটের মুখে?

ঐতিহাসিকভাবে অর্থনৈতিক সংকট এসেছে আর্থিক বাজার, জ্বালানি বা রাজনৈতিক সংঘাত থেকে।

কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ভিন্ন।

এটি একযোগে-

* উৎপাদন

* কৃষি

* বাণিজ্য

* শ্রমবাজার

* স্বাস্থ্য

* অবকাঠামো

* বিনিয়োগ

সব খাতকে প্রভাবিত করে।

অর্থাৎ, এটি একটি “Systemic Risk” বা পদ্ধতিগত ঝুঁকি, যা পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে সক্ষম।

জলবায়ু পরিবর্তনকে এখন আর শুধু পরিবেশগত সংকট হিসেবে দেখা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম নির্ধারক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ ও ঘূর্ণিঝড় আজ কেবল আবহাওয়ার ঘটনা নয়; এগুলো উৎপাদন কমায়, মূল্যস্ফীতি বাড়ায়, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে, বাণিজ্য ব্যাহত করে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

একসময় বলা হতো, জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সমস্যা। আজ বাস্তবতা হলো, এটি বর্তমান অর্থনীতির সমস্যা, বর্তমান উন্নয়নের সমস্যা এবং বর্তমান বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার সমস্যা।

সুতরাং, প্রশ্ন আর এই নয় যে জলবায়ু পরিবর্তন অর্থনীতিকে প্রভাবিত করবে কি না; প্রশ্ন হলো, বিশ্ব অর্থনীতি এই পরিবর্তনের সঙ্গে কত দ্রুত এবং কত কার্যকরভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে।