রাজনীতি

“বাংলাদেশে ভোট কি ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করে নাকি কেন্দ্রীয়করণই চালু রাখে?”

ভোট কি বদলাতে পারে ক্ষমতার ভারসাম্য, নাকি স্থিতিশীলতার চক্রান্তে আটকে আছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনকে সাধারণত রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্ভাব্য পুনর্বণ্টন ও সমাধান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়। তাত্ত্বিকভাবে, এটি নাগরিকের ক্ষমতা প্রয়োগের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু বাস্তবে, বিশেষত উন্নয়নশীল বা সীমিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দেখা যায়, নির্বাচন শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তন করতে পারে না। বরং এটি হয়ে ওঠে শাসন টিকে রাখার আনুষ্ঠানিকতা।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এই দ্বন্দ্বকে বিশেষভাবে স্পষ্ট করে: নির্বাচন হয়, কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, বিরোধী শক্তির অনুপস্থিতি ও প্রশাসনিক প্রভাব ভোটকে কেবল আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিণত করে।

নির্বাচনী গণতন্ত্র বনাম শক্তি কেন্দ্রায়ন: ধারণাগত বিশ্লেষণ

নির্বাচনী গণতন্ত্র বোঝায়-

  • জনগণ অংশ নিলে ভোটের মাধ্যমে শাসন নির্বাচিত হয়

  • বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি সক্রিয় থাকে

  • ক্ষমতার পরিবর্তন বাস্তব সম্ভাব্য

অপরদিকে, শক্তি কেন্দ্রায়ন মানে-

  • নির্দিষ্ট দল বা নেতা কেন্দ্রিক শাসন

  • প্রশাসন ও সরকারি কাঠামোর নিয়ন্ত্রণে শাসন

  • নির্বাচন হয়, কিন্তু ফলাফলের প্রভাব সীমিত

এই দুইয়ের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখাই কোনো রাষ্ট্রের টেকসই গণতন্ত্রের মূল চাবিকাঠি।

কেন ভোট ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে ব্যর্থ?

বিরোধী রাজনীতির সংকট

প্রধান বিরোধী শক্তি অনেক সময় নির্বাচনে অনুপস্থিত বা অংশগ্রহণ সীমিত

নতুন বা ছোট রাজনৈতিক দলকে কার্যকরভাবে জায়গা পেতে বাধা

ফলাফল আগেই নির্ধারিত হওয়ার ভান

ফলে ভোটার থাকলেও রাজনৈতিক বিকল্প প্রকৃত অর্থে নেই, ক্ষমতা কেন্দ্রে থাকে।

প্রশাসন ও নির্বাচনের প্রভাব

সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রায়শই ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থে পরিচালিত হয়

নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পক্ষপাতের অভিযোগ

ভোটের পরিবেশে প্রশাসনিক চাপ

এতে ভোটাধিকার থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতার প্রকৃত বিতরণ ঘটে না।

সামাজিক চাপ ও অনৈতিক আনুগত্য

স্থানীয় রাজনৈতিক চাপ, ভয় বা প্রতিশোধের আশঙ্কা ভোটারকে প্রভাবিত করে

রাজনৈতিক সমর্থন বা বিরোধতা নানান সামাজিক ও পারিবারিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে

ফলে ভোটার হয় কার্যকর নির্বাচক নয়, বরং নিরাপদ অংশগ্রহণকারী।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: কোথাও অনুরূপ পরিস্থিতি?

বিশ্বের অনেক দেশেই দেখা যায় নির্বাচনী প্রক্রিয়া চললেও, ক্ষমতা একটি কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে থাকে।

নির্বাচনের ফলাফল শুধু নির্বাচনী বৈধতা তৈরি করে, রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, অনেক ক্ষেত্রে বৈধ নির্বাচনই শাসকের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার হাতিয়ার।

বাংলাদেশও এই অভিজ্ঞতার প্রাসঙ্গিক উদাহরণ দেয়, যেখানে ভোট হয়, কিন্তু রাজনৈতিক শক্তি মূলত কেন্দ্রে অটুট থাকে।

ভোট কি এখন সমাধান, নাকি আনুষ্ঠানিকতা?

নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান তখনই সম্ভব যখন-

  • ভোটের বিকল্প বাস্তব ও প্রতিযোগিতামূলক হয়

  • প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ থাকে

  • বিরোধী শক্তি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে

  • ভোটের ফলাফলের ওপর জনগণের আস্থা থাকে

যদি এই শর্ত পূরণ না হয়, নির্বাচন কেবল প্রতীকী প্রক্রিয়া, যা রাজনৈতিক সমাধান নয়-অর্থাৎ আনুষ্ঠানিকতা।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

নির্বাচন নিয়মিত হয়, কিন্তু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ক্ষমতার বিতরণ আগের মতোই

বিরোধী দল অনুপস্থিত বা ক্ষমতার বাইরে

প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রভাব নির্বাচনের স্বতন্ত্রতা সীমিত করে

ফলে নির্বাচনী গণতন্ত্রের ধারণা রয়ে গেলো কাগজে, বাস্তবে শাসনের ধারাবাহিকতা ও কেন্দ্রীকরণই অগ্রাধিকার পায়।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

  • গণতন্ত্রের আস্থা ক্ষয়

  • ভোট আছে, কিন্তু জনগণের প্রকৃত অংশগ্রহণ নেই

  • রাজনীতি রাস্তায় স্থানান্তরিত

  • বিরোধী শক্তি প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে প্রতিবাদমূলক

  • প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা

  • ক্ষমতার স্বতন্ত্র বিতরণ না থাকায় শাসন প্রক্রিয়া দুর্বল

সমাধানের দিকনির্দেশনা

নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন-

  • সক্রিয় ও শক্তিশালী বিরোধী দল

  • নিরপেক্ষ প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন

  • নিরাপদ ভোট পরিবেশ

  • জনগণের আস্থা ও রাজনৈতিক শিক্ষা

  • নির্বাচনের ফলাফলের ওপর স্বচ্ছ জবাবদিহি

এই শর্ত পূরণ হলে নির্বাচন কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, রাজনৈতিক সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু হবে।

নির্বাচন যদি রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা রক্ষার হাতিয়ার হয়, কিন্তু রাজনৈতিক বিকল্প এবং জনগণের প্রভাবকে সীমিত করে, তাহলে এটি হয় কেবল আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া।

বাস্তব গণতন্ত্রে নির্বাচন তার প্রকৃত লক্ষ্য পূরণ করে, যখন বৈধতা এবং স্থিতিশীলতা একসঙ্গে চলে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এই ভারসাম্যের উপর নির্ভর করছে, নির্বাচনকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা না করে, শক্তির সমন্বয় ও অংশগ্রহণের প্রধান মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলা হবে কি না, সেটিই চূড়ান্ত প্রশ্ন।