নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর নেতাকর্মীদের দলীয় কার্যালয়ে প্রবেশের চেষ্টা বা তালা খুলে ভেতরে ঢোকার খবর সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে। কোথাও তারা সফল হয়েছেন, কোথাও আবার পাল্টা দখল, হামলা বা বাধার মুখে পড়েছেন।
এই তৎপরতা কি দলীয় নির্দেশে, নাকি ব্যক্তিগত উদ্যোগে? নাকি এর পেছনে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে কোনো সমঝোতা রয়েছে— এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন সরকার ২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের মে মাসে দলটির অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর কার্যক্রমও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ-কে নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।
সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও এর সব সহযোগী সংগঠনের যেকোনো ধরনের প্রচারণা, সভা-সমাবেশ, মিছিল বা প্রকাশনা কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে।
এই নিষেধাজ্ঞার ফলে দলটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম দাবি করেছেন, দলীয় কার্যালয় নিষিদ্ধ বা বাজেয়াপ্ত করা হয়নি। ফলে নেতাকর্মীদের সেখানে যাওয়া রাজনৈতিক অধিকারের মধ্যেই পড়ে।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এখানে নির্দেশনা বা সমঝোতার কিছু নেই। কর্মী-সমর্থকরা দলীয় কার্যালয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক।”
অন্যদিকে ছাত্রলীগের এক কর্মী রিহান সরদার জানান, দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা-এর একটি বার্তা তারা পেয়েছেন, যেখানে সারাদেশে যার যেখানে সম্ভব দলীয় কার্যালয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
দলীয় সূত্রের দাবি, বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে শেখ হাসিনা তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কার্যালয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
অতএব, তৃণমূলের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নীরব সম্মতি বা উৎসাহও থাকতে পারে— এমন ধারণা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর স্থানীয় নেতারা আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন— এমন অভিযোগ শোনা যাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, কিছু জায়গায় নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কার্যালয় খোলার ক্ষেত্রে বাধা না দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। তবে সব এলাকায় সেই সমঝোতা কার্যকর হয়নি; কোথাও আবার প্রতিপক্ষের ভিন্ন গ্রুপের বাধায় হামলা-ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
নির্বাচনের পরদিন পঞ্চগড়ে আওয়ামী লীগের একটি ইউনিয়ন কার্যালয়ের তালা খোলার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেখানে স্থানীয় বিএনপি নেতা আবু দাউদ প্রধানের উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
এরপর চাঁদপুর, ঠাকুরগাঁও, সাতক্ষীরা, বরগুনার বেতাগী, পটুয়াখালীর দশমিনা, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, শরীয়তপুর, নোয়াখালী, জামালপুর, রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন স্থানে কার্যালয় খোলা বা প্রবেশের খবর আসে।
ময়মনসিংহের তারাকান্দায় কার্যালয় খোলার পর সেখানে বিক্ষোভ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, তেজগাঁওয়ে ঢাকা জেলা কার্যালয় এবং ধানমন্ডিতে সভাপতির কার্যালয়ে পূর্বে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
ঐতিহাসিক ‘ধানমন্ডি ৩২’— বঙ্গবন্ধু ভবন—ও ভাঙচুরের শিকার হয়।
নির্বাচনের পর ১৪ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং ২০ ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডিতে সভানেত্রীর কার্যালয়ের সামনে স্লোগান দেওয়া— এসব ঘটনাকে অনেকেই প্রতীকী রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, নির্বাচিত সরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চায়। সে প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের রাজনৈতিক পরিসরে ফেরার সুযোগ দেওয়া ইতিবাচক হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমানের মতে, নির্বাচিত সরকার আসার পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম পুনরারম্ভের একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তার ভাষায়, “নিষিদ্ধ মানেই চিরতরে নিষিদ্ধ নয়।”
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই তৎপরতার পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে—
রাজনৈতিক পুনর্বাসনের চেষ্টা: নির্বাচনের পর নতুন বাস্তবতায় দলীয় অস্তিত্ব জানান দেওয়া।
প্রতীকী শক্তি প্রদর্শন: সংগঠন নিষিদ্ধ হলেও কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি জানান দেওয়া।
সমঝোতার রাজনীতি: স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তববাদী সমন্বয়ের চেষ্টা।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চাপ তৈরি: মাঠপর্যায়ে সক্রিয়তা দেখিয়ে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া।
আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে প্রবেশ বা খোলার ঘটনাগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন তৎপরতা নয়; বরং তা দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি ইঙ্গিত বহন করছে। দলীয় নির্দেশ, তৃণমূলের উদ্যোগ এবং স্থানীয় সমঝোতার সম্ভাবনা— সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল ও বহুমাত্রিক।
এখন নজর থাকবে, নির্বাচিত সরকার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসে কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং মাঠপর্যায়ের এই তৎপরতা ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলে।