বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র একটি বহুল প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থা হলেও বাস্তবতা হলো- অনেক গণতান্ত্রিক দেশেই জনগণের মধ্যে সরকারের প্রতি অসন্তোষ লক্ষ্য করা যায়। তাত্ত্বিকভাবে বাক-স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলেও, এর কার্যকর প্রয়োগ খুব কম দেশেই দৃশ্যমান। এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, যখনই বাক-স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে, তখনই জনঅসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করেছে। বাকশাল প্রণয়ন-এর সময়কাল থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে জনগণের ক্ষোভের অন্যতম বড় কারণ ছিল মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা। দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনার সুযোগ না থাকা, ভিন্নমত দমনের অভিযোগ এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সংকীর্ণ পরিসর, এসব বিষয় জনমনে চাপা ক্ষোভ তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
এই পটভূমিতে ২০২৪ সালের আগস্টে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পরিবর্তন দেশের ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করে এবং সরকার গঠনের পথ সুগম হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর জন্য। তবে সরকার পরিবর্তনের পরই জনমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে- নতুন সরকার কি গণতন্ত্রের কার্যকর চর্চা নিশ্চিত করতে পারবে? জনগণ কি তাদের কাঙ্ক্ষিত বাক-স্বাধীনতা ফিরে পাবে, নাকি পূর্ববর্তী শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতাই বজায় থাকবে?
এমন প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস তাঁর অবস্থান তুলে ধরেছেন।
বেসরকারি টেলিভিশন, ‘চ্যানেল আই’-এর জনপ্রিয় টকশো ‘ভিন্নমতে সহমত’-এ দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের কার্যক্রমের সমালোচনা করার প্রধান দায়িত্ব বিরোধী দলের ওপর বর্তায়। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কার্যকর ও দায়িত্বশীল বিরোধী দল এখনো গড়ে ওঠেনি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মির্জা আব্বাসের ভাষায়, দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক চর্চার ঘাটতির কারণেই একটি শক্তিশালী ও দেশপ্রেমিক বিরোধী রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়নি। তিনি বলেন, “আমরা সেই পথটা তৈরি করতে চাই।” তাঁর মতে, গঠনমূলক সমালোচনা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে এবং সরকারকে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখে। তবে এমন সমালোচনা, যা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বা জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি করে, তা গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি, দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে যেমন অবাধ মতপ্রকাশ নিশ্চিত করতে হয়, অন্যদিকে তা যেন ভ্রান্ত তথ্য বা উসকানিমূলক বক্তব্যে রূপ না নেয়, সেদিকেও নজর রাখতে হয়। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ভারসাম্য রক্ষা করাই নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
সার্বিকভাবে, দেশের জনগণ এখন অপেক্ষা করছে, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় গণতন্ত্র কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় এবং বাক-স্বাধীনতা কতটা বাস্তবিকভাবে প্রতিফলিত হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে সরকারের প্রতি জনআস্থা কেমন হবে।