রাজনীতি

সংরক্ষিত আসন নারীর ক্ষমতায়নের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম: নেওয়াজ হালিমা আরলী

নিজস্ব প্রতিবেদক

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে দেশে দীর্ঘদিন ধরেই নানা বিতর্ক রয়েছে। অনেকের মতে, সরাসরি ভোটে নির্বাচিত না হওয়ায় তাদের কার্যকর ভূমিকা সীমিত। তবে এই ধারণার সঙ্গে একমত নন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য, নেওয়াজ হালিমা আরলী । তাঁর মতে, সংরক্ষিত আসনের মূল উদ্দেশ্যই হলো সমাজের অবহেলিত, পিছিয়ে পড়া ও প্রান্তিক নারীদের কণ্ঠস্বরকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরা।

বেসরকারি টেলিভিশন, ‘চ্যানেল আই’- এর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘ভিন্নমতে সহমত’-এ দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সংসদ সদস্য হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি যে বিষয়গুলো তাকে নাড়া দেয়, তার মধ্যে রয়েছে বিবাহবিচ্ছেদের পর নারীদের ভরণপোষণ সংকট, নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের অসহায়ত্ব এবং সমাজের প্রান্তিক মানুষের ন্যায্য অধিকার না পাওয়ার বাস্তবতা।

তিনি বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনের সাংবিধানিক দায়িত্ব কেবল সংসদে উপস্থিত থাকা নয়, বরং সেইসব মানুষের প্রতিনিধি হওয়া, যাদের কথা সাধারণত নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছায় না। দেশের অর্ধেকেরও বেশি জনগোষ্ঠী নারী হওয়ায় তাদের সমস্যা, সম্ভাবনা ও অধিকার নিয়ে কাজ করাকেই আমি নিজের প্রধান দায়িত্ব বলে মনে করি।

সংরক্ষিত আসনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুযোগ তুলনামূলক কম থাকলেও সমাজ গঠনে নারীদের ভূমিকা অনেক গভীর। একজন মা যেমন একটি পরিবার গড়ে তোলেন, তেমনি নারীর ক্ষমতায়ন একটি সুস্থ সমাজ বিনির্মাণের ভিত্তি তৈরি করে। তাই নারী, পরিবার ও সামাজিক উন্নয়ন নিয়ে কাজ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের প্রতিও কম নয়। বিশেষ করে নারীরা সহজেই নিজেদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যার কথা আমাদের কাছে তুলে ধরতে পারেন। একজন নারী প্রতিনিধির কাছে নিজেদের কথা বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

নিজের রাজনৈতিক পথচলার কথা তুলে ধরে হালিমা আরলী বলেন, ছাত্রজীবন থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার মানসিকতা থেকে রাজনীতিতে যুক্ত হই। দীর্ঘদিন নারী সংগঠন এবং দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার অভিজ্ঞতা আমাকে মানুষের কাছাকাছি থাকতে সহায়তা করেছে। সংসদে নিজের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জনসম্পৃক্ত যেকোনো যৌক্তিক বিষয়ে আমি সোচ্চার হতে চাই। বিশেষ করে নারী অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমস্যাগুলোকে সংসদে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে আমার।

নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মের নারীদের রাজনীতিকে ঘৃণা না করে পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দেখতে হবে। সমাজ, পরিবার ও দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই রাজনীতিতে আসা প্রয়োজন। কারণ রাজনীতির মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নারীদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, অধিকাংশ নারী নিজের জন্য কিছু চান না; বরং সন্তানদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, বিয়ে, পরিবার এবং এলাকার উন্নয়ন নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন থাকেন। এসব বাস্তব সমস্যার সমাধানেই কাজ করতে চাই।

সংরক্ষিত নারী আসনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এই সাংসদ বলেন, ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় নারীদের কণ্ঠস্বরকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এখনও নারীরা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। ফলে তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা এখনো ফুরিয়ে যায়নি।

পরিশেষে রাজনৈতিক অভিমত ব্যক্ত করে হালিমা আরলী বলেন, রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশসেবা। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও মানুষের কল্যাণে কাজ করার ক্ষেত্রে সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। 

আমার মতে, “এলাকা আমাদের, জেলা আমাদের, বাংলাদেশ আমাদের, সবাইকে আপন ভাবতে হবে। মানুষের জন্য কাজ করাই একজন রাজনীতিকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।”