সবচেয়ে বেশি ফুটবলার কোন ক্লাবের? বিশ্বজয়ের ট্রফি ছুঁয়ে দেখা কতজন মাঠ মাতাবেন এবার? রয়েছে ১৭ বছরের মেক্সিকান কিশোর আর ৪৩ বছর বয়সী 'বুড়ো' স্কটিশ গোলরক্ষকের বয়সের আকাশ-পাতাল ব্যবধান! থাকছে ৬ ফুট ৯ ইঞ্চি উচ্চতার অস্ট্রিয়ান 'দানব' গোলরক্ষকের পাশে মাত্র ৫ ফুট ৩ ইঞ্চির পানামানিয়ান মিডফিল্ডারের উচ্চতার বৈপরীত্য।
উত্তর আমেরিকার মাটিতে ফুটবল বিশ্বকাপ মাঠে গড়ানোর আগে অংশগ্রহণকারী ৪৮টি দলের স্কোয়াড ঘেঁটে এমনই সব চমকপ্রদ পরিসংখ্যানের গল্প চলুন জেনে নেওয়া যাক।
ক্লাব ফুটবলের বিবেচনায় বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া সবচেয়ে বেশি ২০০ জন খেলোয়াড় আছেন ইংল্যান্ডের বিভিন্ন ক্লাবে। এরপর রয়েছে জার্মানি (১০৯), ফ্রান্স (৮৬), স্পেন (৮৬), ইতালি (৭১), সৌদি আরব (৪৯), তুরস্ক (৪৫), যুক্তরাষ্ট্র (৪২), নেদারল্যান্ডস (৪৬), ব্রাজিল (৩৬) ও পর্তুগাল (৩৬)।
স্কটল্যান্ডের ৪৩ বছর বয়সী গোলরক্ষক ক্রেইগ গর্ডন বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ইতিহাসের দ্বিতীয় বয়স্ক খেলোয়াড় হতে যাচ্ছেন। তার চেয়ে বেশি বয়সে বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ডটি কেবল মিশরের গোলরক্ষক এসাম এল হাদারির, ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে যার বয়স ছিল ৪৫ বছর।
টুর্নামেন্ট শুরুর দিনে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর বয়স হবে ৪১ বছর ১২৬ দিন। পর্তুগিজ এই ফরোয়ার্ড মাঠে নামলে তিনি হবেন বিশ্বকাপের ইতিহাসের চতুর্থ বয়স্ক খেলোয়াড়।
গর্ডন ও রোনালদোর পর ২৩তম বিশ্বকাপের সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড়দের তালিকায় আছেন মেক্সিকোর গোলরক্ষক গিয়ের্মো ওচোয়া, ক্রোয়েশিয়ার মিডফিল্ডার লুকা মদ্রিচ, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার স্ট্রাইকার এদিন জেকো, জার্মানির গোলরক্ষক মানুয়েল নয়্যার ও কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। তাদের সবার বয়স ৪০ বছর।
নিজেদের ঘরোয়া লিগের খেলোয়াড়দের নিয়ে স্কোয়াড গড়ার ক্ষেত্রে সবার ওপরে যৌথভাবে আছে কাতার ও সৌদি আরব। দুই দলেরই ২৫ জন করে খেলোয়াড় খেলেন নিজ দেশের ক্লাবে। শুধু কাতারের লেফট-ব্যাক হোমায়াম আহমেদ খেলছেন স্পেনের কালচারাল লিওনেসার হয়ে, আর সৌদির রাইট-ব্যাক সৌদ আব্দুলহামিদ খেলছেন ফ্রান্সের লেঁসে।
বিপরীতে, ছয়টি দল— কেপ ভার্দে, কঙ্গো ডিআর, আইভরি কোস্ট, কুরাসাও, সেনেগাল ও উরুগুয়ের স্কোয়াডের একজন খেলোয়াড়ও নিজেদের দেশের ঘরোয়া লিগে খেলেন না।
২০২৬ বিশ্বকাপে খেলতে যাচ্ছেন বিশ্বকাপজয়ী ২২ জন। নয়্যার ২০১৪ সালে জার্মানির হয়ে শিরোপা জিতেছিলেন। আর উসমান দেম্বেলে, লুকাস হার্নান্দেজ, এনগোলো কান্তে ও কিলিয়ান এমবাপে ২০১৮ সালে ফ্রান্সকে বিশ্বজয়ের স্বাদ এনে দিয়েছিলেন।
আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি ধরে রেখেছেন সবশেষ কাতার বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়া সেই স্কোয়াডের ১৭ জন তারকাকে। তারা হলেন— লিওনেল মেসি, থিয়াগো আলমাদা, হুলিয়ান আলভারেজ, রদ্রিগো দি পল, এঞ্জো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্তার, এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, লাউতারো মার্তিনেজ, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ, লিওনেল মেসি, নাহুয়েল মলিনা, গঞ্জালো মন্তিয়েল, নিকোলাস ওতামেন্দি, এজেকিয়েল পালাসিওস, লিয়ান্দ্রো পারদ্রেস, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, জেরোনিমো রুলি ও নিকোলাস তাগলিয়াফিকো।
সবচেয়ে বেশি ১৯ জন ফুটবলার নিয়ে ফুটবলের এই মহাযজ্ঞে ক্লাব হিসেবে শীর্ষে অবস্থান করছে ম্যানচেস্টার সিটি। আলজেরিয়া, বেলজিয়াম, ক্রোয়েশিয়া, মিশর, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ঘানা, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, পর্তুগাল, স্পেন ও উজবেকিস্তানের স্কোয়াডে সিটির খেলোয়াড়রা আছেন।
এরপর রয়েছে বায়ার্ন মিউনিখ (১৮ জন), আর্সেনাল (১৬), পিএসজি (১৬), বার্সেলোনা (১৫), আল হিলাল (১২), অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদ (১২), ক্রিস্টাল প্যালেস (১২), ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড (১২), বরুশিয়া ডর্টমুন্ড (১১), গ্যালাতাসারাই (১১) ও লিভারপুল (১১)।
এবারের আসরের সবচেয়ে তরুণ খেলোয়াড় হলেন ১৭ বছর বয়সী গিলবার্তো মোরা। মেক্সিকো দলে তার সতীর্থ ওচোয়া যখন ২০০৬ সালে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ খেলেন, তখন মোরার জন্মই হয়নি! মাঠে নামার সুযোগ পেলে এই প্লে-মেকার হবেন কনকাকাফ (উত্তর, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান) অঞ্চলের ইতিহাসের কনিষ্ঠতম বিশ্বকাপ ফুটবলার। মোরা ভেঙে দেবেন স্বদেশি মানুয়েল রোসাসের রেকর্ড, যিনি ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে হওয়া বিশ্বকাপের প্রথম আসরে ১৮ বছর বয়সে খেলেছিলেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এবারের বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই যদি মোরা মাঠে নামেন, তবে তিনি হবেন বিশ্বকাপের ইতিহাসের ষষ্ঠ কনিষ্ঠতম খেলোয়াড়। তার আগে থাকবেন কেবল পেলে, সলোমন ওলেম্বে, ফেমি ওপাবুনমি, স্যামুয়েল ইতো ও সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলারের রেকর্ডধারী নরম্যান হোয়াইটসাইড (সবাই ১৭ বছর বয়সী)।
অংশ নিতে যাওয়া খেলোয়াড়দের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৩টি বিশ্বকাপ গোল রয়েছে আর্জেন্টিনার মেসির ঝুলিতে। ১২ গোল নিয়ে তার ঠিক পেছনেই আছেন ফ্রান্সের এমবাপে। এরপর অবস্থান হ্যারি কেইন (৮ গোল), নেইমার (৮ গোল) ও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর (৮ গোল)। আর বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৬টি গোলের রেকর্ডটি জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার দখলে।
মেসি, রোনালদো ও ওচোয়া রেকর্ড ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ডাক পেয়েছেন। তবে মেসি ও রোনালদোই হতে যাচ্ছেন ইতিহাসের প্রথম দুই ফুটবলার, যারা সরাসরি ছয়টি বিশ্বকাপে মাঠে নামবেন। কারণ, ওচোয়া ২০০৬ ও ২০১০ সালের বিশ্বকাপে স্কোয়াডে থাকলেও মাঠে নামার সুযোগ পাননি।
অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক ফ্লোরিয়ান ভিয়েগেলে— যার উচ্চতা ২.০৫ মিটার (প্রায় ৬ ফুট ৯ ইঞ্চি), তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে লম্বা খেলোয়াড় হিসেবে স্কোয়াডে জায়গা করে নিয়েছেন। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ২.০৩ মিটার উচ্চতা নিয়ে আগের রেকর্ডটি গড়েছিলেন নেদারল্যান্ডসের গোলরক্ষক অ্যান্ড্রিয়েস নোপার্ট। এবারের আসরে ভিয়েগেলের পর সবচেয়ে লম্বা খেলোয়াড়দের তালিকায় আছেন ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার ড্যান বার্ন (২.০১ মিটার), কলম্বিয়ার গোলরক্ষক আলভারো মন্তেরো (২.০১ মিটার) ও বসনিয়ার সেন্টার-ব্যাক স্তেপান রাদেলিচ (২.০১ মিটার)।
পানামার প্লে-মেকার সিজার ইয়ানিস ১.৬০ মিটার (৫ ফুট ৩ ইঞ্চি) উচ্চতা নিয়ে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে খাটো খেলোয়াড়। তার ঠিক পরেই আছেন কুরাসাওয়ের ফরোয়ার্ড জেরেমি আন্তোনিসে (১.৬৪ মিটার)। গ'এল' গ্রুপের শেষ ম্যাচে যখন পানামা ও ইংল্যান্ড মুখোমুখি হবে, তখন বার্ন ও ইয়ানিসের মধ্যকার উচ্চতার ব্যবধান দাঁড়াবে ৪১ সেন্টিমিটার! এর আগে বিশ্বকাপে একই ম্যাচে মুখোমুখি হওয়া দুই প্রতিপক্ষের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৯ সেন্টিমিটার উচ্চতার ব্যবধান দেখা গিয়েছিল ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে, সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর স্ট্রাইকার নিকোলা জিগিচ ও আইভরি কোস্টের বাকারি কোনের মধ্যে।