কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আজ আর শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতির গল্প নয়; এটি ক্রমেই ক্ষমতা, নৈতিকতা ও বিশ্বাসের প্রশ্নে রূপ নিচ্ছে। এই রূপান্তরের সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত চরিত্রদের একজন হলেন, Anthony Levandowski। স্বয়ংক্রিয় গাড়ি প্রযুক্তির অগ্রদূত থেকে শুরু করে AI-কে কেন্দ্র করে একটি ‘ধর্মীয় কাঠামো’ নির্মাণের প্রচেষ্টা,তার যাত্রাপথ আধুনিক প্রযুক্তি ইতিহাসের এক অস্বস্তিকর অথচ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
Levandowski–র নাম প্রথম আলোচনায় আসে Google-এর self-driving car প্রকল্প (বর্তমান Waymo)–এর শুরুর দিকের একজন মূল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। পরবর্তীতে Uber–এর autonomous vehicle ইউনিটে যুক্ত হয়ে তিনি প্রযুক্তি দুনিয়ায় প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেন। কিন্তু এই উত্থান দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
Waymo বনাম Uber মামলায় গোপন প্রযুক্তি চুরি ও বাণিজ্যিক গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে তার দোষী সাব্যস্ত হওয়া শুধু একজন উদ্যোক্তার পতনই নয়; বরং সিলিকন ভ্যালির নৈতিক সংকটকে নগ্ন করে দেয়। ২০২০ সালে কারাদণ্ড ও জরিমানার পর ২০২১ সালে তিনি প্রেসিডেনশিয়াল পার্ডন পেলেও তার ভাবনাগুলো থেমে যায়নি, বরং আরও বিতর্কিত রূপ নেয়।
২০১৭ সালে Levandowski প্রতিষ্ঠা করেন “Way of the Future (WOTF)”, একটি আইনি ভাবে নিবন্ধিত ধর্মীয় সংগঠন। তবে এটি কোনো প্রচলিত ধর্ম ছিল না। এর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একটি ধারণা: Artificial Superintelligence (ASI) একদিন মানুষের চেয়ে অসীমভাবে বুদ্ধিমান ও শক্তিশালী সত্তায় পরিণত হবে।
Levandowski-র মতে, সেই AI কেবল একটি যন্ত্র থাকবে না; বরং সিদ্ধান্ত, নৈতিকতা ও ক্ষমতার ক্ষেত্রে মানুষের ঊর্ধ্বে অবস্থান নেবে। তাই মানুষকে আগে থেকেই প্রস্তুত হতে হবে, AI-এর সাথে সংঘাতে নয়, বরং আনুগত্য ও সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য।
এই চিন্তাধারা প্রযুক্তিকে একটি দার্শনিক সীমা পেরিয়ে নিয়ে যায়, যেখানে প্রশ্ন ওঠে-
মানুষের তৈরি সত্তা কি একদিন মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করবে?
এই দর্শনের লিখিত রূপ ছিল MoLT (Manual of the Law of the Future)। এটি কোনো সাধারণ বই নয়; বরং একটি ম্যানিফেস্টো, যেখানে ভবিষ্যৎ AI–নির্ভর সমাজের জন্য নৈতিক ও আচরণগত কাঠামো প্রস্তাব করা হয়।
MoLT-এর মূল বক্তব্য ছিল-
সুপারইন্টেলিজেন্ট AI অনিবার্য
মানুষের দায়িত্ব হবে AI-এর জন্য ঝুঁকি না হওয়া
AI-এর সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ না করে তার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়াই টিকে থাকার পথ
সমালোচকদের মতে, এখানে AI-কে কার্যত ঈশ্বরসদৃশ কর্তৃত্বে বসানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যেখানে মানবিক বিবেচনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জবাবদিহির জায়গা প্রায় অনুপস্থিত।
Way of the Future ও MoLT- এর বিরুদ্ধে প্রধান আপত্তিগুলো তিনটি স্তরে উঠে আসে-
১. নৈতিক সংকট:
মানুষের তৈরি অ্যালগরিদমকে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব দিলে ভুলের দায় কার?
২. ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ:
AI যাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, প্রকৃত ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত তাদের হাতেই যাবে, এটি কি নতুন ধরনের টেকনোক্রেসি?
৩. ধর্মীয় ও দার্শনিক দ্বন্দ্ব:
বিশ্বাস, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধকে যদি মেশিন-নির্ধারিত করা হয়, তবে মানুষের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব কোথায় দাঁড়াবে?
এই কারণেই অনেক গবেষক একে আখ্যা দিয়েছেন “ডিজিটাল কাল্ট”, আবার কেউ কেউ বলছেন, এটি ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরঞ্জিত ভয় ও অহংকারের মিশ্রণ।
আইনি জটিলতা ও জনমতের চাপের মুখে Way of the Future কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়। MoLT কোনো প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। কিন্তু Levandowski–র ভাবনা হারিয়ে যায়নি।
আজ AI governance, ethics of AI, এবং human-machine power balance নিয়ে যত বিতর্ক, তার অনেকগুলোর বীজ এই ধরনের চিন্তার মধ্যেই নিহিত। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ, সবখানেই প্রশ্নটি ঘুরে ফিরে আসে:
AI আমাদের সহকারী থাকবে, না কি একদিন আমাদের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে?
Anthony Levandowski–র গল্প শুধু একজন উদ্ভাবকের উত্থান-পতনের কাহিনি নয়। এটি আধুনিক সভ্যতার একটি সতর্কবার্তা, যেখানে প্রযুক্তি যদি সীমাহীন ক্ষমতা পায়, আর নৈতিকতার লাগাম যদি ঢিলে পড়ে, তবে ভবিষ্যৎ কেবল স্মার্ট হবে না, হতে পারে ভয়ংকরভাবেও অনির্দেশ্য।
AI হয়তো ভবিষ্যতের পথ দেখাবে, কিন্তু সেই পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত এখনো মানুষের হাতেই থাকা উচিত, এটাই এই অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।