তথ্যপ্রযুক্তি

কোয়ান্টাম কম্পিউটার প্রযুক্তি: আগত সুপার পাওয়ারের আদ্যোপান্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

একসময় কোয়ান্টাম কম্পিউটার ছিল বিজ্ঞান কল্পকাহিনির বিষয়। কিন্তু এখন এটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ওষুধ আবিষ্কার, প্রতিরক্ষা গবেষণা, সবখানেই কোয়ান্টাম প্রযুক্তি নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন দৌড়। প্রযুক্তি জায়ান্ট ‘আইবিএম’, ‘গুগল’ এবং ‘মাইক্রোসফট’ এখন ভবিষ্যতের “কম্পিউটিং সুপারপাওয়ার” হওয়ার লড়াইয়ে বিনিয়োগ করছে বিলিয়ন ডলার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যেভাবে একসময় সেমিকন্ডাক্টর ও ইন্টারনেট বিশ্বকে বদলে দিয়েছিল, কোয়ান্টাম কম্পিউটিংও তেমনি আগামী কয়েক দশকের প্রযুক্তিগত শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার আসলে কী?

প্রচলিত কম্পিউটার তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে “বিট” ব্যবহার করে, যার মান হয় ০ অথবা ১।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার ব্যবহার করে “কিউবিট” (Qubit), যা একইসঙ্গে ০ এবং ১, দুই অবস্থাতেই থাকতে পারে।

এই বৈশিষ্ট্যের কারণে, কোয়ান্টাম কম্পিউটার কিছু নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান প্রচলিত সুপার কম্পিউটারের তুলনায় বহুগুণ দ্রুত করতে সক্ষম হতে পারে।

কেন এটিকে “ভবিষ্যতের সুপারপাওয়ার” বলা হচ্ছে?

কারণ এটি শুধু দ্রুত কম্পিউটার নয়, বরং সম্পূর্ণ নতুন ধরনের কম্পিউটিং আর্কিটেকচার।

সম্ভাব্য ব্যবহার:

  • জটিল ওষুধ আবিষ্কার

  • জলবায়ু মডেলিং

  • আর্থিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ

  • প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ গবেষণা

  • AI ও মেশিন লার্নিং উন্নয়ন

  • উন্নত ক্রিপ্টোগ্রাফি

সম্প্রতি ‘আইবিএম রিসার্চ’ এবং অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলো ১২ হাজারের বেশি অ্যাটমবিশিষ্ট একটি প্রোটিন সিমুলেশনে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে, যা বাস্তব প্রয়োগের দিকে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

আইবিএম- এর গবেষণা: কোথায় এগোচ্ছে বিশ্বর

কোয়ান্টাম গবেষণায় বর্তমানে সবচেয়ে সক্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হলো, আইবিএম কোয়ান্টাম।

আইবিএম- এর রোডম্যাপ অনুযায়ী, তারা ২০২৯ সালের মধ্যে বড় আকারের, 'ত্রুটি-সহনশীল' বা 'ত্রুটি-নিরোধক' কম্পিউটার (“Fault-tolerant quantum computer”) তৈরি করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। 

আইবিএম-এর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি:

  • ১,০০০+ কিউবিট সিস্টেমে অগ্রসর হওয়া

  • ‘কোয়ান্টাম ত্রুটি সংশোধন’ (Quantum Error Correction) প্রযুক্তি উন্নয়ন

  • ‘কোয়ান্টাম-সুরক্ষিত ক্রিপ্টোগ্রাফি’ (Quantum-safe cryptography) নিয়ে গবেষণা

  • ক্লাউডের মাধ্যমে কোয়ান্টাম কম্পিউটার অ্যাক্সেস

আইবিএম ইতোমধ্যে, সুইজারল্যান্ডের বিশ্ববিখ্যাত সরকারি গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়, ‘ইটিএইচ জুরিখ’ (ETH Zurich)- এর সঙ্গে এআই ও কোয়ান্টাম অ্যালগরিদম নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা সহযোগিতাও শুরু করেছে। 

সাইবার নিরাপত্তায় সবচেয়ে বড় প্রভাব

কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো সাইবার সিকিউরিটি।

বর্তমান বিশ্বের প্রায় সব এনক্রিপশন সিস্টেম- ব্যাংকিং, রাষ্ট্রীয় যোগাযোগ, ই-কমার্স, গাণিতিক সমস্যার উপর নির্ভরশীল, যা প্রচলিত কম্পিউটারের জন্য সমাধান করা অত্যন্ত কঠিন।

কিন্তু শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার ভবিষ্যতে এই এনক্রিপশন ভেঙে ফেলতে সক্ষম হতে পারে। 

‘ক্রিপ্টোগ্রাফিক এনক্রিপশন ব্যবস্থা’ (Q-Day) প্রযুক্তি: বিশ্বের নতুন আতঙ্ক

বিশেষজ্ঞরা একটি সম্ভাব্য সময়কে “Q-Day” নামে উল্লেখ করেন। যেদিন কোয়ান্টাম কম্পিউটার প্রচলিত এনক্রিপশন কার্যকরভাবে ভাঙতে পারবে।

এর ফলে ঝুঁকিতে পড়তে পারে:

  • ব্যাংকিং সিস্টেম

  • সামরিক যোগাযোগ

  • রাষ্ট্রীয় ডেটাবেজ

  • ক্রিপ্টোকারেন্সি

  • ক্লাউড অবকাঠামো

এমনকি “Harvest Now, Decrypt Later” (এখনই সংগ্রহ, ভবিষ্যতে উন্মোচন), নামে একটি উদ্বেগও এখন আলোচনায়। যেখানে সাইবার অপরাধীরা আজকের এনক্রিপ্টেড ডেটা সংগ্রহ করে ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম কম্পিউটারে তা ডিক্রিপ্ট করার অপেক্ষায় থাকতে পারে। 

তাহলে কি বর্তমান ইন্টারনেট নিরাপত্তা শেষ?

এখনই নয়।

গবেষকরা বলছেন, বর্তমান ও নিকট ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম কম্পিউটার এখনো এত শক্তিশালী হয়নি যে বৈশ্বিক এনক্রিপশন ভেঙে ফেলতে পারবে। 

তবে ঝুঁকি বাস্তব হওয়ায় বিশ্ব ইতোমধ্যে, “Post-Quantum Cryptography” (কোয়ান্টাম-নিরাপদ এনক্রিপশন প্রযুক্তি)-র দিকে এগোচ্ছে।

‘আইবিএম’ নিজেও, “কোয়ান্টাম-সুরক্ষা ক্রিপ্টোগ্রাফি” (Quantum-safe cryptography) নিয়ে কাজ করছে এবং নতুন প্রজন্মের নিরাপদ অ্যালগরিদম তৈরিতে অংশ নিচ্ছে। 

প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা: এখনো কেন চ্যালেঞ্জ?

কোয়ান্টাম কম্পিউটার এখনো “NISQ Era” (Noisy Intermediate-Scale Quantum) বা ‘মধ্যবর্তী-স্কেল কোয়ান্টাম’ পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ এটার-

  • কিউবিট খুব অস্থির

  • ত্রুটির হার বেশি

  • সিস্টেম অত্যন্ত ব্যয়বহুল

  • বড় স্কেলে স্থিতিশীলতা এখনো কঠিন

গবেষকদের মতে, কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করতে এখনো বহু প্রযুক্তিগত বাধা অতিক্রম করতে হবে। 

ভূরাজনীতি: নতুন প্রযুক্তি যুদ্ধ

কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এখন কেবল প্রযুক্তি নয়, এটি কৌশলগত শক্তির অংশ।

আমেরিকা, চীন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে এই খাতে বড় বিনিয়োগ করছে।

কারণ, যে দেশ কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকবে, ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও সাইবার নিরাপত্তায় তার প্রভাবও বাড়বে।

বাংলাদেশ: সুযোগ নাকি দূরের স্বপ্ন?

বাংলাদেশ এখনো কোয়ান্টাম গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে। তবে এআই, সেমিকন্ডাক্টর এবং উচ্চশিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়লে ভবিষ্যতে গবেষণাভিত্তিক অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ:

  • কোয়ান্টাম-দক্ষ (Quantum-ready) মানবসম্পদ তৈরি

  • বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা

  • সাইবার নিরাপত্তায় প্রস্তুতি

  • কোয়ান্টাম-পরবর্তী ক্রিপ্টোগ্রাফি (Post-quantum cryptography) নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি

চূড়ান্ত বিশ্লেষণ

কোয়ান্টাম কম্পিউটার এখনো মূলধারার প্রযুক্তি নয়, কিন্তু এটি আর কল্পবিজ্ঞানও নয়।

বিশ্ব ধীরে ধীরে এমন এক বাস্তবতার দিকে যাচ্ছে, যেখানে কম্পিউটিং ক্ষমতার সংজ্ঞাই বদলে যেতে পারে।

এটি যেমন মানবজাতির সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হতে পারে, তেমনি সাইবার নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও হয়ে উঠতে পারে।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার হয়তো আগামীকালই আমাদের হাতে চলে আসবে না।

কিন্তু যেদিন এটি পরিপক্ব হবে, সেদিন প্রযুক্তি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য, সবকিছুই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হবে।

আজকের ‘এআই’ বিপ্লবের পর,

আগামী বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত শব্দটি হয়তো একটাই, ‘কোয়ান্টাম’