তথ্যপ্রযুক্তি

প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতিতে শ্রমের অদৃশ্য চুক্তি

রাইড শেয়ারিং, ডেলিভারি অ্যাপ ও ‘স্বাধীন কর্মী’ মিথ

নিজস্ব প্রতিবেদক

এক সময় শ্রম মানেই ছিল অফিস, কারখানা কিংবা নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা। আজ সেই সংজ্ঞা বদলে গেছে। স্মার্টফোনের স্ক্রিনে একটি অ্যাপ খুলে কাজ পাওয়া যায়, আবার অ্যাপ বন্ধ হলেই কাজ শেষ। এই নতুন বাস্তবতার নাম প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতি। যেখানে উবার, পাঠাও, ফুডপান্ডা, র‍্যাপিডো কিংবা ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস শ্রম ও বাজারের মধ্যস্থতাকারী হয়ে উঠেছে।

এই অর্থনীতি নিজেকে উপস্থাপন করে স্বাধীনতার ভাষায়-

  • “নিজের সময় নিজে ঠিক করুন”,

  • “নিজেই আপনার বস”

  • “ইচ্ছেমতো কাজ, ইচ্ছেমতো আয়।”

কিন্তু এই স্বাধীনতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ধরনের অদৃশ্য চুক্তি, যেখানে দায়িত্ব আছে, কিন্তু অধিকার অস্পষ্ট।

প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতি কীভাবে কাজ করে?

প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতি মূলত একটি ডিজিটাল মধ্যস্থতাকারী ব্যবস্থা-

  • প্ল্যাটফর্ম কাজ দেয় না, কাজের সুযোগ “ম্যাচ” করে

  • শ্রমিককে কর্মচারী নয়, “স্বাধীন কর্মী” বা “পার্টনার” বলা হয়

  • নিয়োগ, বরখাস্ত, মূল্য নির্ধারণ, সব হয় অ্যালগরিদমের মাধ্যমে

কাগজে-কলমে এখানে কোনো নিয়োগপত্র নেই, নেই নির্দিষ্ট চুক্তি। কিন্তু বাস্তবে শ্রমিকের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রিত হয় প্ল্যাটফর্মের নিয়মে।

‘স্বাধীন কর্মী’ ধারণার ভাঙন

স্বাধীন কর্মী মানে-

  • নিজের কাজের সময় নিজে ঠিক করবে

  • কাজ না করলে কোনো শাস্তি নেই

  • আয় ও ঝুঁকির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে

কিন্তু প্ল্যাটফর্ম শ্রমে বাস্তবতা ভিন্ন-

  • নির্দিষ্ট সময় কাজ না করলে রেটিং কমে

  • রেটিং কমলে কাজ পাওয়া বন্ধ হয়

  • অ্যালগরিদম ঠিক করে কে বেশি কাজ পাবে

  • ভাড়া, কমিশন ও ইনসেনটিভ একতরফাভাবে পরিবর্তন হয়

অর্থাৎ শ্রমিক কাগজে স্বাধীন, কিন্তু বাস্তবে অ্যালগরিদম-নিয়ন্ত্রিত কর্মী।

অদৃশ্য চুক্তি: কী আছে, কী নেই

এই শ্রম ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- চুক্তিটি দৃশ্যমান নয়, কিন্তু প্রভাব বাস্তব।

যা আছে

  • কাজের বাধ্যবাধকতা

  • রেটিং ভিত্তিক শাস্তি ও পুরস্কার

  • একতরফা নিয়ম পরিবর্তনের ক্ষমতা

যা নেই

  • ন্যূনতম মজুরি নিশ্চয়তা

  • স্বাস্থ্য ও দুর্ঘটনা বিমা

  • ছুটি, অসুস্থতা ভাতা

  • ট্রেড ইউনিয়ন বা দরকষাকষির অধিকার

ফলে ঝুঁকি পুরোপুরি শ্রমিকের, লাভের বড় অংশ প্ল্যাটফর্মের।

বাংলাদেশের বাস্তবতা: ডিজিটাল অনানুষ্ঠানিক শ্রম

বাংলাদেশে প্ল্যাটফর্ম শ্রম দ্রুত বাড়ছে-

  • রাইড শেয়ারিং ও ডেলিভারি

  • অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং

  • কনটেন্ট মডারেশন ও ডিজিটাল মাইক্রো-টাস্ক

এই শ্রমিকরা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও আইনগতভাবে তারা প্রায় অদৃশ্য।

  • তারা শ্রম আইনের আওতায় পড়ে না

  • সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার বাইরে থাকে

  • আয় অনিশ্চিত ও মৌসুমি

ফলে প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতি এক ধরনের ডিজিটাল অনানুষ্ঠানিক খাত তৈরি করছে।

অ্যালগরিদম: নতুন ম্যানেজার

এই ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে অ্যালগরিদম-

  • কোন শ্রমিক কাজ পাবে

  • কোন রুট লাভজনক

  • কোন সময় কাজ করলে ইনসেনটিভ

  • সব সিদ্ধান্ত নেয় একটি অদৃশ্য কোড।

এই কোডের যুক্তি শ্রমিক জানে না, চ্যালেঞ্জ করতে পারে না।

ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

অর্থনৈতিক লাভ, সামাজিক খরচ

প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতি কর্মসংস্থান তৈরি করেছে, এটা সত্য।

কিন্তু এর সামাজিক খরচও কম নয়-

  • আয়-অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ

  • দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, বিশ্রামের অভাব

  • দুর্ঘটনায় ব্যক্তিগত ক্ষতির দায়

  • দীর্ঘমেয়াদে দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সীমিত

এই শ্রম ভবিষ্যতের নিরাপত্তা তৈরি করে না, কেবল বর্তমানের টিকে থাকার ব্যবস্থা করে।

বিশ্বজুড়ে বিতর্ক ও নীতিগত লড়াই

বিশ্বের অনেক দেশেই প্রশ্ন উঠেছে, এই শ্রমিকরা কি সত্যিই স্বাধীন?

  • ইউরোপের কিছু দেশে প্ল্যাটফর্ম শ্রমিককে কর্মচারী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে

  • কোথাও ন্যূনতম মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে

  • কোথাও আবার প্ল্যাটফর্মগুলো আইনি লড়াই চালাচ্ছে

বাংলাদেশে এই বিতর্ক এখনো প্রাথমিক স্তরে।

ভবিষ্যৎ কোন পথে?

প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতি বন্ধ করা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই।

কিন্তু এটিকে মানবিক ও ন্যায়সঙ্গত করা জরুরি।

প্রয়োজন-

  • প্ল্যাটফর্ম শ্রমের জন্য আলাদা আইনি কাঠামো

  • ন্যূনতম আয় ও বিমা সুরক্ষা

  • অ্যালগরিদমিক স্বচ্ছতা

  • শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার

নচেৎ প্রযুক্তি সুবিধা দেবে ঠিকই, কিন্তু শ্রমকে আরও অনিরাপদ করে তুলবে।

শেষ কথা

প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতি আমাদের কাজের ধরন বদলে দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়-

এই পরিবর্তন কাদের পক্ষে কাজ করছে?

যেখানে চুক্তি নেই, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ আছে, সেখানে স্বাধীনতা একটি বর্ণনামাত্র হয়ে দাঁড়ায়।

প্ল্যাটফর্ম শ্রমের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর-

আমরা কি প্রযুক্তিকে মানুষের জন্য ব্যবহার করব, নাকি মানুষকেই প্রযুক্তির উপকরণে পরিণত করব?