‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ থেকে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’, শব্দের এই পরিবর্তনটি শুনতে যতটা আধুনিক, বাস্তবতা কি ততটাই রূপান্তরিত? প্রশ্নটি আজ আর শুধু রাজনৈতিক স্লোগানের নয়; এটি প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থার গভীরে গিয়ে দাঁড়ানো একটি মৌলিক অনুসন্ধান।
ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণার মূল লক্ষ্য ছিল তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার- ইন্টারনেট সংযোগ, ডিজিটাল সেবা, অনলাইন কার্যক্রম। দীর্ঘ এক দশকে সেই লক্ষ্য আংশিকভাবে পূরণও হয়েছে। এখন ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বলছে আরও এক ধাপ এগোনোর কথা- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট গভর্ন্যান্স, স্মার্ট অর্থনীতি ও স্মার্ট নাগরিক। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়: এটা কি কাঠামোগত উন্নয়ন, নাকি পুরোনো বাস্তবতার নতুন নামকরণ?
স্মার্ট ধারণার চার স্তম্ভ: কাগজে নিখুঁত, বাস্তবে অসম্পূর্ণ
স্মার্ট বাংলাদেশের ধারণা দাঁড়িয়ে আছে চারটি স্তম্ভের ওপর, স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট সরকার, স্মার্ট অর্থনীতি ও স্মার্ট সমাজ। কাগজে এই কাঠামো আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ এখনও খণ্ডিত।
স্মার্ট নাগরিক গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, প্রযুক্তি বোঝার সক্ষমতা ও সমালোচনামূলক চিন্তা। অথচ বাস্তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের বিস্তার ঘটলেও ডিজিটাল লিটারেসি এখনও সীমিত। অনেক ক্ষেত্রেই নাগরিক প্রযুক্তির ব্যবহারকারী, কিন্তু নিয়ন্ত্রক বা বোদ্ধা নন।
ই–গভর্ন্যান্স বনাম স্মার্ট গভর্ন্যান্স
ডিজিটাল বাংলাদেশ মূলত ই–গভর্ন্যান্সে জোর দিয়েছিল, অনলাইনে ফরম, অ্যাপ, সেবা। স্মার্ট গভর্ন্যান্সের দাবি আরও গভীর: তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত, স্বচ্ছতা, অটোমেশন ও জবাবদিহি।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক ডিজিটাল সেবাই এখনও মানবনির্ভর সিদ্ধান্ত ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে। প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে, কিন্তু প্রক্রিয়ার মানসিকতা বদলায়নি। ফলে স্মার্ট শব্দটি অনেক সময় শুধু ইন্টারফেসে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে।
স্মার্ট অর্থনীতি: সম্ভাবনা আছে, প্রস্তুতি কতটা?
স্মার্ট অর্থনীতির কথা বললে আসে স্টার্টআপ, ফিনটেক, এআই–ভিত্তিক শিল্প, ডেটা অর্থনীতি। বাংলাদেশে এই খাতে সম্ভাবনা অস্বীকার করার উপায় নেই। তরুণ জনগোষ্ঠী, কম খরচের শ্রমবাজার ও দ্রুত ডিজিটাল গ্রহণ- সবই অনুকূলে।
কিন্তু সমস্যা হলো নীতিগত প্রস্তুতি ও দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি। উদ্ভাবন এখনও অনেকটাই আমদানি–নির্ভর। গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ সীমিত। ফলে স্মার্ট অর্থনীতি গড়ে উঠছে, কিন্তু তা টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারছে না।
নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ: স্মার্ট না হলে ঝুঁকি বাড়ে
স্মার্ট রাষ্ট্র মানে শুধু দ্রুত সেবা নয়, নিরাপদ সেবাও। এআই, বিগ ডেটা ও ডিজিটাল নজরদারি যেমন সুবিধা দেয়, তেমনি গোপনীয়তা ও নাগরিক অধিকার প্রশ্নে ঝুঁকিও তৈরি করে।
বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ, ডেটা সুরক্ষা ও এআই ব্যবহারে এখনও স্পষ্ট ও হালনাগাদ নিয়ন্ত্রণ কাঠামো দুর্বল। স্মার্ট হওয়ার পথে যদি আইন, নৈতিকতা ও প্রযুক্তির ভারসাম্য না থাকে, তাহলে উন্নয়ন নয়, ঝুঁকিই বাড়বে।
রি–ব্র্যান্ডিং নাকি রূপান্তর-ফয়সালা কোথায়?
স্মার্ট বাংলাদেশ যদি শুধু নাম বদল হয়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। আর যদি এটি হয় প্রশাসনিক সংস্কার, শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রযুক্তি–ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাস্তব রূপান্তর, তাহলেই এর অর্থ থাকবে।
স্মার্টনেস কোনো অ্যাপ নয়, কোনো স্লোগান নয়। এটি একটি মানসিকতা, কাঠামো ও সক্ষমতার সমন্বিত পরিবর্তন।
শেষ কথা
ডিজিটাল বাংলাদেশ আমাদের প্রযুক্তির দরজায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
স্মার্ট বাংলাদেশ দাবি করছে- সেই দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢোকার সাহস।
শব্দ বদলানো সহজ।
কাঠামো বদলানো কঠিন।
প্রশ্ন হলো-আমরা কোন পথে হাঁটছি?