বিশ্বের অন্যতম ধনী প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক তার রকেট নির্মাতা সংস্থা SpaceX-কে আরেকটি প্রধান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান xAI-এর সাথে একীভূত করেছে—যা কেবল একটি ব্যবসায়িক যোগজোড়া নয়, বরং মহাকাশ-ভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ডেটা সেন্টার তৈরির এক বহুল আকাঙ্ক্ষিত পরিকল্পনার প্রারম্ভিক ধাপ বলেও বিবেচিত হচ্ছে।
এই ঐতিহাসিক একীকরণের ফলে SpaceX-xAI এর সম্মিলিত মূল্যায়ন প্রায় $1.25 ট্রিলিয়ন (প্রায় ১,৮১১ হাজার কোটি টাকা) হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে — যা প্রযুক্তি ও মহাকাশ খাতে বিরাট মাত্রার বিনিয়োগ ও প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন।
মাস্ক জানিয়েছেন, পরবর্তী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে মহাকাশে ডেটা সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা কার্যকর করা হবে। এর লক্ষ্য হলো
- শক্তি-সম্পন্ন এবং পরিবেশ-বান্ধব সোলার শক্তি দিয়ে AI-এর প্রয়োজনীয় বিশাল পরিমাণ কম্পিউটিং পাওয়ার সরবরাহ করা,
- পৃথিবীর বাইরের স্থানে AI-ভিত্তিক ইন্সটিটিউশনাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি করা, যাতে শক্তি ও শীতলীকরণের খরচ কমে যায়, এবং
- পৃথিবীর গ্রিডের উপর চাপ কমিয়ে মহাকাশ-ভিত্তিক সংস্থা হিসেবে AI-এর উন্নয়ন চালানো।
মাস্ক বলেন, AI-এর শক্তি-চাহিদা “পৃথিবীতে আর বাঁচানো যায় না” এবং সে কারণেই ‘স্পেস-ভিত্তিক AI’ হবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। তিনি মনে করেন, সূর্যের শক্তি ব্যবহার করে মহাকাশে AI-এর কম্পিউটিং সক্ষমতা তৈরি করা হবে—যা এ ধরনের উন্নত প্রযুক্তির জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী সমাধান।
পরিকল্পিত মহাকাশ-ভিত্তিক AI ডেটা সেন্টার গঠনে কিছু মূল উপাদান হলো—
- উড়ন্ত ডেটা কেন্দ্র: SpaceX মহাকাশে সংখ্যায় একটি বিশাল স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক তৈরি করবে, যেখানে প্রত্যেক স্যাটেলাইট নিজেদের সোলার শক্তি ব্যবহার করে AI কম্পিউটিং কার্যক্রম চালাবে।
- ১০০ গিগাওয়াট AI ক্ষমতা লক্ষ্য: মাস্কের পরিকল্পনায়, বছরে স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক থেকে মোট ১০০ গিগাওয়াট AI কম্পিউটিং পাওয়ার অর্জন করার লক্ষ্য রয়েছে, যা AI-ভিত্তিক বিশ্লেষণ ও উদ্ভাবনকে মহাকাশ থেকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে।
- উচ্চ স্তরের স্কেলিং: পরবর্তীতে মহাকাশ-ভিত্তিক কম্পিউটিংকে আরও বর্ধিত করে টেরাবাইট স্তরের বা তারও বেশি ক্ষমতা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হতে পারে—এটি পৃথিবীর স্থলভিত্তিক AI উদীয়মান প্রযুক্তির সক্ষমতার বাইরেও যেতে পারে।
SpaceX-xAI একীভূত হওয়ার পেছনের মূল ভাবনা হলো—AI ইঞ্জিন ও মহাকাশ প্রযুক্তিকে একত্রিত করে একটি ‘ইন্টারপ্লানেটারি ইন্টেলিজেন্স’ ইকোসিস্টেম তৈরি করা। এতে—
- Starlink স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক,
- Starship রকেট উড়ান সক্ষমতা,
- বৃহৎ পরিমাণ সোলার শক্তি সংস্থান নিশ্চিত করা,
- এবং AI-ভিত্তিক পরিমাপ ও বিশ্লেষণের জন্য ডেটা কেন্দ্র স্থাপন—এসব একসাথে কাজ করবে।
মাস্ক বলেন, মহাকাশ-ভিত্তিক কম্পিউটিং “AI-এর সবচেয়ে কম খরচে কর্মক্ষমতা” প্রদান করবে এবং এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে চাঁদ ও মঙ্গলেও বিস্তার লাভ করবে—এটি শুধু ব্যবসায় নয়, মানবজাতির আরেকটি মহান প্রযুক্তিগত মাইলফলক হতে পারে।
এই মহাকাশ-ভিত্তিক AI ডেটা সেন্টারের পরিকল্পনা সমর্থকদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করলেও প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে—
- এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল প্রকল্প, যার জন্য প্রচুর অর্থ, রকেট উৎক্ষেপণ ক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত স্থায়িত্ব প্রয়োজন হবে।
- পাশাপাশি Amazon Web Services (AWS) এর প্রধান নির্বাহী বলেছে যে মহাকাশ-ভিত্তিক ডেটা সেন্টার প্রযুক্তি “এখনও বাস্তবে পরিণত হতে অনেক দূরে”, কারণ এটি বহু লগিস্টিকাল ও আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
তবে অন্য প্রযুক্তি জায়ান্ট-রা যেমন Google ও তার Project Suncatcher এ ধরনের মহাকাশ-ভিত্তিক উদ্যোগের দিকে আগ্রহ দেখাচ্ছে, যা প্রযুক্তি ও শক্তিচাহিদার ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বৃদ্ধি করছে।
এই পদক্ষেপের ফলে আগামী কয়েক বছর—বিশেষ করে ২০২৭-২০৩০ সময়কালে—AI ও মহাকাশ প্রযুক্তির সমন্বিত উদ্ভাবন ও শক্তিশালী কম্পিউটিং অবকাঠামোর বিকাশ দেখা যেতে পারে। SpaceX-xAI একীভূতি কেবল একটি ব্যবসার মজবুতীকরণ নয়; এটি AI-এর ভবিষ্যৎকে মহাকাশ-ভিত্তিক কম্পিউটিং পরিমাপের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি মহাকাশ-ভিত্তিক AI ডেটা সেন্টার বাস্তবে আসে, তাহলে—
- পরিবেশগত চাপ কমবে,
- শক্তির চাহিদা আরও সাশ্রয়ী হবে,
- এবং AI-এর গ্লোবাল স্কেল কম্পিউটিং ক্ষমতা একটি নতুন মাত্রা পাবে।
মাস্কের SpaceX-xAI একীভূতি ও মহাকাশ-ভিত্তিক AI ডেটা সেন্টারের পরিকল্পনা প্রযুক্তি দুনিয়ার এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ—যা মহাকাশ প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য এক নতুন যুগের সূচনা হতে পারে। যদিও এটি এখনও অনেক বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও আর্থিক চ্যালেঞ্জে ঘেরা, যদি সফল হয়, তা AI ও মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক মাইলফলক হয়ে থাকবে।