তথ্যপ্রযুক্তি

অনলাইন সেবা: দুর্নীতি কমাচ্ছে, নাকি নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক

ডিজিটাল রূপান্তরের যুগে রাষ্ট্রীয় সেবা আর ফাইলের স্তূপে আটকে নেই, স্মার্টফোনের স্ক্রিনেই এখন জন্মনিবন্ধন, কর পরিশোধ, ভূমি রেকর্ড, এমনকি আদালতের কার্যক্রমের বড় অংশও। বাংলাদেশে “ডিজিটাল” থেকে “স্মার্ট” অভিযাত্রায় অনলাইন সেবা একদিকে যেমন গতি ও স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, অন্যদিকে তৈরি করেছে নতুন ধরনের ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ।

প্রশ্নটি তাই প্রাসঙ্গিক- এই ডিজিটাল সেবা কি সত্যিই দুর্নীতি কমাচ্ছে, নাকি কেবল তার রূপ বদলে দিচ্ছে?

ডিজিটাল রূপান্তরের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে গত এক দশকে সরকারি সেবার ডিজিটালাইজেশন দ্রুত এগিয়েছে। এটুআই (a2i) প্রোগ্রাম- এর নেতৃত্বে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা নাগরিক সেবাকে অনলাইনে নিয়ে এসেছে।

জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, কর, ভূমি, সব ক্ষেত্রেই তৈরি হয়েছে ই-সেবা প্ল্যাটফর্ম।

এর পাশাপাশি বিকাশ- এর মতো মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস পেমেন্টকে সহজ করেছে, যা সরকারি ফি জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যবহার হচ্ছে।

দুর্নীতি কমানোর সম্ভাবনা: কীভাবে কাজ করে?

১. মানবিক সংস্পর্শ কমানো

অনলাইন সেবা সরাসরি “মানুষ-টু-মানুষ” যোগাযোগ কমায়, যেখানে ঘুষ বা অনৈতিক লেনদেনের সুযোগ বেশি থাকে।

যেমন, পাসপোর্ট আবেদন বা ট্যাক্স ফাইলিং অনলাইনে করলে দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর প্রয়োজন কমে।

২. স্বচ্ছতা ও ট্র্যাকিং

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রতিটি আবেদন ও লেনদেনের ডিজিটাল ট্রেইল থাকে।

কে কখন আবেদন করলো, কোথায় আটকে আছে, সবই ট্র্যাকযোগ্য। এতে জবাবদিহিতা বাড়ে।

৩. সময় ও খরচ কমানো

আগে একটি সেবা পেতে দিনের পর দিন অফিসে ঘুরতে হতো। এখন কয়েক মিনিটেই আবেদন করা যায়।

এই দক্ষতা বাড়ার ফলে “তাড়াতাড়ি কাজ করাতে টাকা দেওয়া”- এই সংস্কৃতি কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

৪. অটোমেশন

কিছু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অটোমেটেড হওয়ায় মানবিক পক্ষপাত বা দুর্নীতির সুযোগ কমে।

বাস্তবতা: দুর্নীতি কি সত্যিই কমেছে?

আংশিকভাবে- হ্যাঁ।

যেসব সেবা পুরোপুরি ডিজিটাল হয়েছে (যেমন অনলাইন বিল, পরীক্ষার ফল, কিছু সরকারি ফি), সেখানে দুর্নীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

তবে জটিল সেবাগুলো, বিশেষ করে ভূমি, আইন-শৃঙ্খলা, টেন্ডার, এখনো আংশিক ডিজিটাল। সেখানে “ডিজিটাল + ম্যানুয়াল” মিশ্র ব্যবস্থায় দুর্নীতির নতুন পথ তৈরি হয়েছে।

নতুন ঝুঁকি: ডিজিটাল দুর্নীতির উত্থান

১. সাইবার অপরাধ ও হ্যাকিং

ডিজিটাল সিস্টেম যত বাড়ছে, সাইবার হামলার ঝুঁকিও তত বাড়ছে।

ডেটা চুরি, পরিচয় জালিয়াতি, ফিশিং, সবই এখন বড় হুমকি।

২. ডিজিটাল দালাল চক্র

অনলাইন সেবা চালু হলেও “ডিজিটাল দালাল” তৈরি হয়েছে, যারা টাকা নিয়ে অনলাইন আবেদন করে দেয়।

অনেকে নিজেরা করতে না পারায় এই নির্ভরতা বাড়ছে।

৩. অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত

অটোমেটেড সিস্টেম সবসময় নিরপেক্ষ নাও হতে পারে। ভুল ডেটা বা ডিজাইন ত্রুটির কারণে নাগরিকরা বঞ্চিত হতে পারে।

৪. ডেটা প্রাইভেসি সংকট

নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য এখন ডিজিটাল সার্ভারে সংরক্ষিত।

এই ডেটা সুরক্ষিত না হলে বড় ধরনের অপব্যবহার হতে পারে।

৫. “সিস্টেম ম্যানিপুলেশন”

যারা প্রযুক্তি বোঝে, তারা সিস্টেমের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে সুবিধা নিতে পারে, যা একধরনের নতুন দুর্নীতি।

ডিজিটাল হলেও, ডিজিটাল + ম্যানুয়াল মিশ্র ব্যবস্থার কারণে সেবা নিতে লাইনে দাঁড়ানো সংস্কৃতি  এখনও দৃশ্যমান

ডিজিটাল বিভাজন: সবাই কি সমান সুবিধা পাচ্ছে?

বাংলাদেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী এখনো প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ নয়।

গ্রামীণ অঞ্চল, বয়স্ক মানুষ, কম শিক্ষিত জনগোষ্ঠী, তারা অনলাইন সেবা ব্যবহার করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে। ফলে-

  • তারা দালালের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে

  • প্রকৃত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়

এই “ডিজিটাল ডিভাইড” দূর না হলে অনলাইন সেবা বৈষম্য বাড়াতেও পারে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: শেখার সুযোগ

এস্তোনিয়া- কে বিশ্বের সবচেয়ে সফল ই-গভর্নেন্স মডেল হিসেবে ধরা হয়। সেখানে প্রায় সব সরকারি সেবা অনলাইনে, এবং নাগরিকদের ডিজিটাল আইডেন্টিটি অত্যন্ত নিরাপদ।

অন্যদিকে, ভারতের “Digital India” উদ্যোগে ব্যাপক অগ্রগতি হলেও, ডেটা প্রাইভেসি ও ডিজিটাল বৈষম্য নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

বাংলাদেশ এই দুই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে-

প্রযুক্তি + সুরক্ষা + অন্তর্ভুক্তি, এই তিনের ভারসাম্য জরুরি।

কী করতে হবে: নীতিগত ও বাস্তব পদক্ষেপ

১. শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা

  • নিয়মিত সিকিউরিটি অডিট

  • ডেটা এনক্রিপশন

  • সাইবার রেসপন্স টিম শক্তিশালী করা

  • নাগরিকদের তথ্য সুরক্ষায় কঠোর আইন ও তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

২. ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো

  • গ্রামে গ্রামে প্রশিক্ষণ

  • স্কুল-কলেজে ডিজিটাল শিক্ষা

  • সহজ ইউজার ইন্টারফেস

৩. সম্পূর্ণ অটোমেশন ও ইন্টিগ্রেশন

“আধা ডিজিটাল” সিস্টেম সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

সব সেবাকে একীভূত ও সম্পূর্ণ ডিজিটাল করতে হবে।

৪.  জবাবদিহিতা ও মনিটরিং

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ ও ফিডব্যাক সিস্টেম শক্তিশালী করা জরুরি।

ভবিষ্যৎ: স্মার্ট সেবা, নাকি স্মার্ট দুর্নীতি?

প্রযুক্তি নিজে নিরপেক্ষ, এর ব্যবহারই ঠিক করে দেয় ফলাফল।

অনলাইন সেবা দুর্নীতি কমাতে পারে, তবে সঠিক নীতি ও বাস্তবায়ন না হলে এটি “স্মার্ট দুর্নীতি”-র নতুন ক্ষেত্রও তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে তাই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ-

  • একদিকে প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বচ্ছতা বাড়ানো,

  • অন্যদিকে নতুন ঝুঁকি মোকাবিলা করা।

অনলাইন সেবা নিঃসন্দেহে একটি বিপ্লব, যা প্রশাসনিক কাঠামোকে বদলে দিচ্ছে। তবে এটি কোনো “ম্যাজিক সলিউশন” নয়।

দুর্নীতি কমাতে হলে প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন- সুশাসন, নৈতিকতা এবং কার্যকর আইন প্রয়োগ।

সঠিক কৌশল ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকলে, এই ডিজিটাল রূপান্তরই বাংলাদেশকে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং নাগরিকবান্ধব রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে।

অন্যথায়, কাগজের দুর্নীতি বদলে যাবে, কোডের দুর্নীতিতে।