ডিজিটাল যুগে ‘সবুজ প্রযুক্তি’ শব্দটি যতটা আশ্বাসের, বাস্তবতা ততটাই জটিল।
কাগজবিহীন অফিস, ভার্চুয়াল মিটিং, ক্লাউড কম্পিউটিং, সবকিছুই শুনতে পরিবেশবান্ধব।
কিন্তু এই সবুজ গল্পের আড়ালে রয়েছে এক বিশাল শব্দহীন অবকাঠামো- ডেটা সেন্টার, যার পরিবেশগত প্রভাব ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
প্রশ্ন তাই গুরুত্বপূর্ণ:
যে প্রযুক্তি আমাদের পরিবেশ বাঁচানোর কথা বলছে, সে নিজে কতটা পরিবেশবান্ধব?
ডেটা সেন্টার হলো আধুনিক পৃথিবীর অদৃশ্য কারখানা। আমাদের প্রতিটি ইমেইল, ভিডিও স্ট্রিম, ক্লাউড ফাইল, এআই প্রসেসিং, সবকিছুই শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায় সার্ভারের সামনে।
এই সার্ভারগুলো ২৪ ঘণ্টা চালু রাখতে লাগে-
বিপুল বিদ্যুৎ
নিরবচ্ছিন্ন কুলিং সিস্টেম
ব্যাকআপ জেনারেটর
উচ্চক্ষমতার নেটওয়ার্ক
ডেটা যত বাড়ছে, ডেটা সেন্টারের আকার ও শক্তির চাহিদাও তত বাড়ছে। অথচ এই শক্তির বড় অংশই আসে অ-নবায়নযোগ্য উৎস থেকে।
ডিজিটাল প্রযুক্তিকে প্রায়ই ‘ক্লিন ইন্ডাস্ট্রি’ বলা হয়, কারণ এখানে ধোঁয়া নেই, বর্জ্য চোখে পড়ে না। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস যদি কয়লা, গ্যাস বা তেল হয়, তাহলে ডেটা সেন্টার কার্যত সেই দূষণের অংশীদার।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ এখনও ফসিল-ফুয়েল নির্ভর।
ফলে প্রতিটি নতুন ডেটা সেন্টার মানে-
বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ
কার্বন নিঃসরণে নীরব বৃদ্ধি
শহরভিত্তিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি
সবুজ প্রযুক্তির দাবি এখানে গিয়ে ধাক্কা খায় বাস্তবতার সঙ্গে।
ডেটা সেন্টারের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত সমস্যা শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহার নয়, বরং তাপ ব্যবস্থাপনা।
সার্ভার যত শক্তিশালী হয়, তত বেশি তাপ তৈরি করে। এই তাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয়-
এয়ার কন্ডিশনিং
জলভিত্তিক কুলিং
বিশেষ কেমিক্যাল
এর ফলে বাড়ে বিদ্যুৎ খরচ, পানির ব্যবহার এবং পরিবেশে তাপ নিঃসরণ। শহরের ভেতরে ডেটা সেন্টার গড়ে উঠলে স্থানীয় পরিবেশে হিট আইল্যান্ড এফেক্ট আরও তীব্র হয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদাকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে।
এআই মডেল ট্রেনিং ও রিয়েল টাইম প্রসেসিংয়ে লাগে-
উচ্চক্ষমতার GPU
দীর্ঘ সময় ধরে চলা কম্পিউটেশন
বিশাল ডেটা স্টোরেজ
এর মানে, স্মার্ট প্রযুক্তি যত বাড়ছে, ডেটা সেন্টার তত বেশি শক্তি গিলছে। প্রযুক্তি যত ‘ইন্টেলিজেন্ট’ হচ্ছে, পরিবেশগত খরচ তত কমছে না, বরং বাড়ছে।
বাংলাদেশে ডেটা সেন্টার গড়ে তোলাকে ডিজিটাল সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। নিঃসন্দেহে এর প্রয়োজন আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো-
বিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রস্তুতি কতটা?
পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে?
নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার কতটা নিশ্চিত?
যদি পরিকল্পনা ছাড়া ডেটা সেন্টার বাড়তে থাকে, তাহলে ডিজিটাল উন্নয়ন এক সময় পরিবেশগত বোঝায় পরিণত হতে পারে।
সমাধান প্রযুক্তি বন্ধ করা নয়। সমাধান প্রযুক্তিকে দায়িত্বশীল করা।
বিশ্বজুড়ে কিছু প্রবণতা দেখা যাচ্ছে-
নবায়নযোগ্য শক্তি-নির্ভর ডেটা সেন্টার
শক্তি-দক্ষ সার্ভার ডিজাইন
এআই-ভিত্তিক কুলিং অপ্টিমাইজেশন
ডেটা ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এসব পথ অনুসরণ করা ছাড়া বিকল্প নেই।
এই আলোচনার একটি দার্শনিক দিকও আছে।
আমরা কি সত্যিই সীমাহীন ডেটা ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি?
প্রতিটি অটো-প্লে ভিডিও, অপ্রয়োজনীয় ক্লাউড ব্যাকআপ, অ্যালগরিদমিক অতিভোগ, সবকিছুই শক্তি খরচ বাড়ায়।
সবুজ প্রযুক্তি শুধু অবকাঠামোর প্রশ্ন নয়, ব্যবহারের নৈতিকতার প্রশ্নও।
সবুজ প্রযুক্তি একটি প্রতিশ্রুতি।
ডেটা সেন্টার সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব পরীক্ষা।
যদি আমরা শুধু ডিজিটাল সুবিধা দেখি, কিন্তু তার পরিবেশগত মূল্য অগ্রাহ্য করি, তাহলে স্মার্ট ভবিষ্যৎ আসলে টেকসই হবে না।
প্রশ্ন তাই প্রযুক্তির নয়-
প্রশ্ন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির:
আমরা কি উন্নয়ন চাই, নাকি দায়িত্বশীল উন্নয়ন?