

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক উত্তেজনা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই টানাপোড়েনের বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানি, বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রবাহের ওপর।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বাণিজ্যনীতি, শুল্ক আরোপ, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ইইউর সঙ্গে মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং চীন-রাশিয়া ইস্যুতে ভিন্ন অবস্থান এই উত্তেজনাকে আরও ঘনীভূত করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি একতরফাভাবে নতুন শুল্ক বা বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপ করে, তাহলে ইইউও পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে—যার ফলে একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশই তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের দুটি প্রধান বাজার।
ইইউ বাজার: প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি পোশাক রপ্তানি
যুক্তরাষ্ট্র: প্রায় ২০ শতাংশের বেশি রপ্তানি
যদি যুক্তরাষ্ট্র-ইইউ উত্তেজনার ফলে বৈশ্বিক চাহিদা কমে যায় বা নতুন শুল্ক ও বাণিজ্য বাধা সৃষ্টি হয়, তাহলে বাংলাদেশ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
১. রপ্তানি চাহিদায় নেতিবাচক প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ হলো বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির প্রধান দুটি গন্তব্য (মোট রপ্তানির প্রায় ৮০%)। এই দুই ব্লকের মধ্যে পাল্টাপাল্টি শুল্ক (Tariff) আরোপ করা হলে ওই দেশগুলোতে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পাবে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা দিতে পারে। ফলে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে, যা সরাসরি বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের চাহিদা কমিয়ে দেবে।
২. তীব্র প্রতিযোগিতা ও দাম কমে যাওয়া
২০২৫ ও ২০২৬ সালের শুরু থেকে দেখা যাচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র চীন বা ভারতের মতো দেশগুলোর ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করায় ওই দেশগুলো এখন ইউরোপের বাজারে তাদের পণ্য সস্তায় বিক্রি করার চেষ্টা করছে। এতে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক নির্মাতাদের তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে এবং বাধ্য হয়ে পণ্যের দাম কমাতে (Price Discount) হচ্ছে।
৩. শুল্ক যুদ্ধের পরোক্ষ ঝুঁকি
সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড কেনা বা অন্যান্য ইস্যুতে ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর ১০% থেকে ২৫% পর্যন্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। এর জবাবে ইইউ-ও পাল্টা শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছে। এই ধরনের 'বাণিজ্য যুদ্ধ' বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে, যা বাংলাদেশের মতো রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি।
৪. ভূ-রাজনৈতিক চাপ ও নীতিগত পরিবর্তন
যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ-এর মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে বাংলাদেশ কোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার জন্য ভূ-রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে।
* শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে শর্ত: যেমন—যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে শুল্ক ছাড় পেতে বাংলাদেশ তাদের থেকে তুলা, সয়াবিন বা বিমান কেনার মতো চুক্তি করেছে।
* ইইউ-এর অবস্থান: ইইউ এখন বাংলাদেশের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের মতোই সমতাভিত্তিক বাণিজ্যের দাবি তুলছে, যা বাংলাদেশের জন্য বাড়তি নীতিগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
৫. ব্যাংকিং ও কর্মসংস্থান খাতে ঝুঁকি
রপ্তানি আদেশ কমে গেলে পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হবে। এর ফলে:
* বিশাল সংখ্যক শ্রমিক (প্রায় ৪০ লাখ) কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে।
* ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের (NPL) পরিমাণ বাড়তে পারে, যা দেশের ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাতের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন—
উন্নত দেশগুলোতে মন্দা বাড়লে পোশাকের অর্ডার কমতে পারে
ক্রেতারা দাম কমানোর চাপ বাড়াতে পারে
শ্রমনির্ভর শিল্পে কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে
ডলার সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়তে পারে
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যদি বাণিজ্য সংঘাতে জড়ায়, তাহলে সবচেয়ে আগে প্রভাব পড়বে সরবরাহ চেইনে। এর ধাক্কা আমরা আগেও কোভিড ও ইউক্রেন যুদ্ধের সময় দেখেছি।”
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন অংশীদার। রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে—
উন্নয়ন সহায়তা ও ঋণ ছাড়ে বিলম্ব
বিদেশি বিনিয়োগে সতর্কতা
মানবাধিকার ও নির্বাচন ইস্যুতে চাপ বৃদ্ধি
এসব বিষয় বাংলাদেশের নীতি নির্ধারণে অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য জরুরি—
রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণ (মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা)
পোশাকের পাশাপাশি আইটি, ওষুধ ও কৃষিপণ্য রপ্তানিতে জোর
কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ উভয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা
এলডিসি-পরবর্তী সময়ের জন্য দ্রুত প্রস্তুতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. —— বলেন,
“বাংলাদেশকে এখন বড় শক্তিগুলোর দ্বন্দ্বের বাইরে থেকে বাস্তববাদী কূটনীতি অনুসরণ করতে হবে। একপাক্ষিক ঝুঁকে পড়া অর্থনৈতিকভাবে বিপজ্জনক হতে পারে।”
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান গতিপথ ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইইউ সম্পর্ক সহজে স্বাভাবিক হবে না। ফলে এর প্রভাব ধীরে ধীরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর পড়বে—যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই সতর্ক না হলে বৈশ্বিক উত্তেজনার ঢেউ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন চাপে ফেলতে পারে।