

বিশ্বব্যাপী ফ্রিল্যান্সিং বৃদ্ধি পেয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন আয়ের উৎস হিসেবে। তবে বিদেশি ক্লায়েন্ট থেকে আয় করা ফ্রিল্যান্সারদের সামনে দাঁড়িয়েছে জটিল করনীতি, যা দেশভেদে ভিন্ন, এবং বাংলাদেশি আয়কর কাঠামোর সঙ্গে মিলে না। ফলে আয়ের পূর্ণ মূল্যায়ন ও বৈধ করপ্রণয়ন নিয়ে উদ্ভাবনী সমাধানের প্রয়োজন পড়েছে।
বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিং শিল্প গত দশকে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। আইটি, গ্রাফিক ডিজাইন, কনটেন্ট রাইটিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, সব ক্ষেত্রেই দেশের তরুণদের বৈদেশিক বাজারে প্রবেশ করা সম্ভব হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্ট থেকে আয় মূলত ডলার বা ইউরোতে, যা বাংলাদেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার সরাসরি প্রবাহ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ফ্রিল্যান্সিং রেভিনিউ দেশীয় বৈদেশিক আয় roughly ২.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল, যা প্রতিবছর গড়ে ২০-২৫% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থাৎ, ফ্রিল্যান্সিং কেবল ব্যক্তিগত নয়, দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
ফ্রিল্যান্সার যখন বিদেশি ক্লায়েন্ট থেকে আয় করে, তখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, বিদেশি করনীতি। দেশভেদে কর কাঠামো আলাদা। কিছু দেশে আয় কর নির্ধারণ করার আগে সোর্সিং রাষ্ট্রে কর কর্তনের প্রথা আছে, যেমন ইউরোপের অনেক দেশ বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ফ্রিল্যান্সারের জন্য সোর্সিং ট্যাক্স প্রযোজ্য।
ফলে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের মূল চ্যালেঞ্জ হলো- একই আয়ের ওপর দুই দেশে কর দিতে হবে না। এই দ্বৈত করের ঝুঁকি যদি স্পষ্টভাবে সমাধান না হয়, আয়ের বড় অংশ বিদেশে আটকে থাকে বা শূন্যরূপে খরচ হয়ে যায়।
বর্তমানে বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্স আয়ের ওপর কিছুটা শর্তসাপেক্ষ কর প্রযোজ্য। তবে বিষয়টি এখনও অনেক ফ্রিল্যান্সারের কাছে জটিল। প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো-
কর অনিশ্চয়তা:
ফ্রিল্যান্স আয়ের ধরন, আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্ট ও প্রাপ্ত রেমিটেন্স কিভাবে করায় অন্তর্ভুক্ত হবে, এটি স্পষ্ট নয়।
দলিল ও রিপোর্টিং জটিলতা:
ব্যাংক ট্রান্সফার, PayPal, Stripe, Payoneer, এসব মাধ্যমে অর্থ প্রাপ্ত হলে তা সরকারের কাছে রিপোর্ট করার প্রক্রিয়া ধীর ও জটিল।
ডাবল ট্যাক্সেশন ঝুঁকি:
আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টের দেশে সোর্সিং ট্যাক্স থাকলে এবং বাংলাদেশে আয়ের ওপর কর দিতে হলে, ফ্রিল্যান্সারের আয়ের বড় অংশ কমে যায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্বচ্ছ, সহজ ও আন্তর্জাতিক মান অনুসারী কর কাঠামো না থাকলে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সিং শিল্পের বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হবে।
একজন ফ্রিল্যান্সার সাধারণত ভাবেন, “আমার আয় কি বৈধভাবে কর দেওয়া হবে? কিভাবে আয়ের অংশ দেশে আনব? কতটা কর দিতে হবে?”
এই অনিশ্চয়তা দুইভাবে প্রভাব ফেলে:
আয়ের একটি বড় অংশ দেশের বাইরে আটকে থাকে, বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে দেশে আসেনা।
ফ্রিল্যান্সারদের আস্থা কমে যায়, ফলে তারা আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টের বদলে স্থানীয় প্রজেক্টে মনোযোগ দেয়, যা বৈদেশিক রেভিনিউয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বহু দেশ দুইপক্ষীয় কর চুক্তি (Double Taxation Agreement - DTA) করে ফ্রিল্যান্স আয়ের ওপর দ্বৈত কর রোধ করছে। বাংলাদেশও DTA আছে, কিন্তু ফ্রিল্যান্সারদের প্রাপ্য সুবিধা পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছে না, প্রক্রিয়া জটিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সহজীকরণ ও ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন, স্বয়ংক্রিয় কর ছাড়, এবং বৈদেশিক আয় সমন্বয় ব্যবস্থা আনা হলে, বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের আন্তর্জাতিক আয় বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহও বেড়ে যাবে।
ফ্রিল্যান্সিং শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো হলো-
নিরাপদ এবং সহজ রেমিট্যান্স ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
ডাবল ট্যাক্সেশন ঝুঁকি দূর করা।
কর কাঠামোতে স্বচ্ছতা ও সহজ প্রক্রিয়া তৈরি করা।
ফ্রিল্যান্স আয়ের বৈদেশিক এবং দেশীয় কর সমন্বয় করা।
যদি এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সিং শিল্প আন্তর্জাতিক মানে প্রতিযোগিতা করতে পারবে এবং বৈদেশিক আয়তে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।
ফ্রিল্যান্সিং শিল্প বাংলাদেশে বৈদেশিক আয় আনার শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু বিদেশি করনীতি ও বাংলাদেশের কর কাঠামোর জটিলতা না হলে, এর পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। আস্থা, স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মানের কর সমন্বয় ছাড়া, দেশের তরুণ প্রজন্মের আয়কর-সচেতনতা ও বৈদেশিক আয় দুইই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ফলে প্রশ্ন একটাই, বাংলাদেশ কি ফ্রিল্যান্সিং শিল্পকে বৈদেশিক আয়ের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলবে, নাকি সীমিত ও জটিল কর ব্যবস্থার কারণে সুযোগ হারাবে?