

দেশের প্রধান বাণিজ্যিক বন্দরের অচলাবস্থা সাম্প্রতিক কয়েকদিনে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে—কেননা বন্দরের কার্যক্রমে বিঘ্ন শুধু স্থানীয় মালিকানায় সীমাবদ্ধ নয়, সমগ্র অর্থনীতি জুড়ে প্রভাব ফেলতে পারে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নিয়ে চলমান বিরোধ ও শ্রমিক আন্দোলনের কারণে গত দুই দিন ধরে বন্দরে কার্যক্রম প্রায় অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। এতে কন্টেইনার পরিচালনা প্রায় ৪০% কমে গেছে এবং ট্রাক, জাহাজ, মালবাহী পরিবহন একটানা দেরিতে চলেছে—ফলে আমদানি-রপ্তানি মালামাল বন্দরের বাইরে অপেক্ষা করছে।
অচলাবস্থার মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—
এনসিটি পরিচালনার বিরোধ: বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালকে বিদেশি সংস্থার কাছে লিজ দেয়ার সিদ্ধান্ত ও সেই প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধ ও হাইকোর্টের রায়কে কেন্দ্র করে শ্রমিক ও কর্মচারীরা শ্রমবিরতি ঘোষণা করেছেন।
বন্দর ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাব: দীর্ঘমেয়াদে বন্দরের লজিস্টিক ও অপারেশন ব্যবস্থাপনাতে সমন্বয়ের অভাব ও প্রশাসনিক ঘাটতি ঘটেছে, যা কার্যক্রমে ধীরগতি সৃষ্টি করেছে।
কন্টেইনার ও জাহাজ জট: বন্দরে কন্টেইনার দ্রুত খালাস না হওয়া ও জাহাজের বার্থিং বিলম্বের কারণে মালামাল বন্ধ হয়ে পড়ছে, যা রপ্তানি-আমদানি ক্রমে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বন্দর অচলাবস্থা কেবল বন্দরের গেটের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকছে না—এর প্রভাব দেশ-ব্যাপী অর্থনীতিতে বিস্তৃত হতে পারে।
রপ্তানি ও আমদানি ব্যাহত:
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশ অর্থনীতির প্রাণ; এখানে প্রায় ৯০% সরাসরি বাণিজ্য চালু থাকে। এ বন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হলে আমদানি সম্পদ পাওয়া কঠিন হয় এবং রপ্তানি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়, যার ফলে ব্যবসায়ী ক্ষতির মুখোমুখি হন।
যোগান শৃঙ্খলে বিরূপ প্রভাব:
বন্দর জট ও বিলম্ব পণ্য সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করলে প্রস্তুতকারক শিল্প—বিশেষত টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্প—র কাঁচামাল মজুদ ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি ও রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
লজিস্টিক খরচ বাড়া:
বন্দর ও রাজ্যগুলোতে যাত্রা বিলম্বের কারণে রাস্তা ও লজিস্টিক খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মতো প্রধান পরিবহন লাইনগুলোতে যান চলাচলের চাপ বৃদ্ধি পেয়ে খরচও প্রায় ৩০-৩৫% পর্যন্ত বাড়ছে, যা ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে।
আর্থিক প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব:
দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা হলে রপ্তানি আয় কমে গিয়ে বিদেশি মুদ্রার প্রবাহে চাপ পড়তে পারে, যা জিডিপি-আয় ও মুদ্রানীতি উভয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
শিল্প মালিকরা ইতোমধ্যেই জানিয়েছেন যে বন্দরে কার্যক্রম শিথিলতার ফলে পোশাক ও অন্যান্য রপ্তানিখাতের অর্ডার কমছে; কিছু কারখানাই বন্ধ হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বন্দর জটের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়ার পাশাপাশি অর্ডার বাতিল বা অন্য দেশে স্থানান্তর এর মতো ক্ষেত্রেও ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (CPA) ইতোমধ্যেই এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং কার্যক্রম ব্যাহত করার “স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী” এর অপচেষ্টার কথাও উল্লেখ করেছে, তবে দ্রুত সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে জানিয়েছে।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক করার জন্য নিয়মিত আলোচনা চালাচ্ছে—যাতে শ্রমিক ধর্মঘট, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং বিদেশি অপারেটর নিয়োগ সংক্রান্ত ইস্যুগুলো দ্রুত মীমাংসা করা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অচলাবস্থা দেশের লজিস্টিক ও বাণিজ্য কাঠামোতে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি সৃষ্টি করতে পারে যদি তা দ্রুত সমাধান না হয়। এর জন্য—
- বন্দরের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণ
- শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও প্রশাসনিক অংশীদারদের সাথে ন্যায্য সংলাপ
- ব্যাপক লজিস্টিক নীতিমালা ও অবকাঠামো উন্নয়ন
- বিকল্প পায়রা বা আন্তঃনৌপথ ব্যবহার বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া
—এগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
রপ্তানি-আমদানির প্রধান দ্বার স্থবির হলে তা শুধু চট্টগ্রামের কাঁচামাল বা পণ্য শুল্কেই নয়, সমগ্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ক্রমবিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন।