

অবকাঠামো, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ অপরিহার্য হলেও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রত্যাশিত হারে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আসছে না। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নীতিগত ঝুঁকি ও কাঠামোগত দুর্বলতা মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় তৈরি হয়েছে এক গভীর ফাঁক।
বিদেশি বিনিয়োগ একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে এটি শুধু পুঁজি আনে না, সঙ্গে নিয়ে আসে প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ও বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনার বাস্তব রূপ এখনও সীমিত। অর্থনৈতিক সূচকে স্থিতিশীলতার কিছু ইঙ্গিত থাকলেও বিদেশি বিনিয়োগের গতি ধীর এবং সেই ধীরগতির পেছনে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগ ঝুঁকির বহুমাত্রিক বাস্তবতা।
বাংলাদেশে গত এক দশকে এফডিআই প্রবাহ ওঠানামার মধ্যেই থেকেছে। কিছু বড় প্রকল্প এলেও সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা তৈরি হয়নি। প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে স্পষ্ট হয়, বাংলাদেশ এখনও বিনিয়োগ আকর্ষণের দৌড়ে পিছিয়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যাটি কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি মূলত আস্থার সংকট।
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যেকোনো দেশে প্রবেশের আগে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে। বাংলাদেশে নির্বাচনকেন্দ্রিক উত্তেজনা, নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে তোলে।
বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত। রাজনৈতিক পরিস্থিতি যদি ঘন ঘন বদলায় বা নীতির স্থায়িত্ব নিয়ে সন্দেহ থাকে, তাহলে বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষা করাই নিরাপদ মনে করেন।
বিদেশি বিনিয়োগে আরেকটি বড় বাধা হলো নীতিগত অনিশ্চয়তা। কর কাঠামোর পরিবর্তন, প্রণোদনার অস্পষ্টতা, অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, এসব বিষয় বিনিয়োগের খরচ ও ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিনিয়োগ অনুমোদনের পর বাস্তবায়নে গিয়ে নিয়মের ব্যাখ্যা বদলে যায়। এই অনিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি বড় ‘রেড ফ্ল্যাগ’।
ডলারের বাজার, মুনাফা প্রত্যাবাসন এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা বিদেশি বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডলার সংকট, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংকিং তারল্য সমস্যা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলেছে।
বিশেষ করে যারা দীর্ঘমেয়াদি শিল্পে বিনিয়োগ করতে চান, তাদের কাছে মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার নিশ্চয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি, লজিস্টিক ও বন্দরের সক্ষমতা উন্নত হলেও তা এখনও পুরোপুরি বিনিয়োগবান্ধব নয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ভূমি অধিগ্রহণ সমস্যা ও চুক্তি বাস্তবায়নের ধীরগতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে।
বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকে উন্নতি হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতায় অনেক বিনিয়োগকারী ভিন্ন চিত্র দেখছেন।
বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সুদের হার বৃদ্ধিও বিনিয়োগ প্রবাহকে প্রভাবিত করছে। তবে একই বৈশ্বিক বাস্তবতায় অনেক দেশ তুলনামূলকভাবে বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারছে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতাকেই সামনে আনে।
একজন বিদেশি বিনিয়োগকারীর চোখে বাংলাদেশে বিনিয়োগ মানে-
রাজনৈতিক ঝুঁকি
নীতিগত অনিশ্চয়তা
মুদ্রা ব্যবস্থাপনার জটিলতা
প্রশাসনিক বিলম্ব
যতক্ষণ না এই ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রিত ও পূর্বানুমেয় হয়, ততক্ষণ বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত ধীরই থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগের গতি ফেরাতে হলে-
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে
নীতির ধারাবাহিকতা ও পূর্বানুমেয়তা নিশ্চিত করতে হবে
বিনিয়োগ অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে
মুদ্রা ও মুনাফা প্রত্যাবাসনে স্বচ্ছতা আনতে হবে
বিনিয়োগকারীর সঙ্গে রাষ্ট্রের আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে
এগুলো ছাড়া শুধু প্রণোদনার ঘোষণা বিনিয়োগ আনতে পারবে না।
বিদেশি বিনিয়োগ কোনো স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্ত নয়; এটি আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বাংলাদেশে সম্ভাবনা আছে- বাজার বড়, শ্রমশক্তি আছে, ভৌগোলিক অবস্থান অনুকূল। কিন্তু রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগ ঝুঁকি সেই সম্ভাবনাকে পূর্ণ বাস্তবতায় রূপ নিতে দিচ্ছে না।
প্রশ্ন এখন একটাই- বাংলাদেশ কি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়তে নীতির বাইরে গিয়ে আস্থার সংকট দূর করতে পারবে? কারণ বিদেশি বিনিয়োগের ধীরগতির মূল কারণ অর্থনীতির ঘাটতি নয়, বিশ্বাসের ঘাটতি।