

দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে ‘সরবরাহ সংকট’ শব্দটি যতবার উচ্চারিত হয়, বাস্তবে তার চেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ‘মজুতদারি’। প্রশ্ন হলো- পণ্য কি সত্যিই নেই, নাকি আছে কিন্তু বাজারে আসছে না? এই দ্বন্দ্বই আজকের বাজার বাস্তবতার কেন্দ্রবিন্দু। চাল, তেল, ডাল থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে রান্নার এলপিজি গ্যাস, সব ক্ষেত্রেই একই চিত্র।
সরবরাহ সংকট একটি বৈধ অর্থনৈতিক ঘটনা। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন জটিলতা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, এসব কারণে সত্যিকারের সংকট তৈরি হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে প্রায়শই দেখা যায়, সংকটের খবর ছড়ানোর আগেই দাম বাড়তে শুরু করে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে বাজার প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং পূর্বপরিকল্পিত।
বিশেষ করে আমদানি-নির্ভর পণ্যে সীমিতসংখ্যক বড় ব্যবসায়ীর হাতে যখন সিংহভাগ সরবরাহ থাকে, তখন ‘সংকট’ অনেক সময় একটি কার্যকর কৌশলে পরিণত হয়, যার মাধ্যমে মজুত রেখে কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি করা হয়।
মজুতদারি মানে কেবল গুদামে পণ্য আটকে রাখা নয়; এটি একটি সময়নির্ধারিত সিদ্ধান্ত। কখন বাজারে পণ্য ছাড়লে সর্বোচ্চ লাভ হবে, এই হিসাবেই মজুত খোলা বা বন্ধ করা হয়। ফলে সরকার যখন দাম কমানোর ঘোষণা দেয় বা শুল্ক ছাড় দেয়, তখনও বাজারে তার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে না।
আইন অনুযায়ী মজুতদারি দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও বাস্তবে বড় মজুতদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। অভিযান হয় মূলত খুচরা বা ছোট পাইকার পর্যায়ে, যেখানে বাজারের মূল নিয়ন্ত্রকরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান।
সম্প্রতি রান্নার এলপিজি গ্যাসের দাম ও সরবরাহ নিয়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা এই বাজার বাস্তবতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা ও আমদানি ব্যয়ের যুক্তি দেখিয়ে স্থানীয় বাজারে দাম বাড়ানো হলেও ভোক্তারা একই সঙ্গে সরবরাহ সংকটের মুখে পড়েছেন।
এলপিজি খাতে কয়েকটি বড় কোম্পানির আধিপত্য থাকায় প্রতিযোগিতা সীমিত। ডিলার পর্যায়ে সময়মতো সরবরাহ না দেওয়া, সিলিন্ডার পুনঃভরার বিলম্ব এবং অঞ্চলভেদে ভিন্ন দাম, সব মিলিয়ে এটি কেবল আন্তর্জাতিক দামের প্রভাব নয়, বরং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও নিয়ন্ত্রণের অভাবকেই সামনে আনে।
বাজার তদারকি সাধারণত সংকটের পর শুরু হয়। কিন্তু মজুতদারি ঠেকাতে প্রয়োজন আগাম নজরদারি। কে কত আমদানি করছে, কত মজুত আছে, কতটা বাজারে ছাড়ছে, এই ডাটা যদি রিয়েল-টাইমে বিশ্লেষণ না করা হয়, তাহলে নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হয় না।
এ ছাড়া একাধিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব বড় সমস্যা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জ্বালানি বিভাগ, প্রতিযোগিতা কমিশন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, সবার কাজ আলাদা হলেও সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ খুব কমই দেখা যায়।
বাস্তবতা হলো- বাজারের লাগাম থাকে সেই গোষ্ঠীর হাতে, যাদের হাতে তথ্য, মজুত ও সময়ের নিয়ন্ত্রণ আছে। তারা জানে কখন সংকটের বার্তা ছড়াতে হবে, কখন পণ্য ছাড়তে হবে। ভোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এই খেলায় কেবল দর্শক।
মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বাজারে স্বচ্ছতা। বড় আমদানিকারক ও সরবরাহকারীদের মজুত তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশ করতে হবে। এলপিজির মতো কৌশলগত পণ্যে ডিলারভিত্তিক সরবরাহ ও মূল্য তদারকি জোরদার করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- নিয়ন্ত্রণকে প্রতিক্রিয়াশীল নয়, প্রতিরোধমূলক করতে হবে। নইলে মজুতদারি বনাম সরবরাহ সংকটের এই দ্বন্দ্বে বারবার হারবে ভোক্তা, আর জিতবে বাজার নিয়ন্ত্রকরা।
মজুতদারি ও সরবরাহ সংকটের বিতর্ক আসলে ক্ষমতার প্রশ্ন। যতদিন বাজারের নিয়ন্ত্রণ কয়েকটি গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকবে এবং তদারকি দুর্বল থাকবে, ততদিন নিত্যপণ্যের দাম ও সংকট ভোক্তার জীবনে অনিশ্চয়তা হয়েই থাকবে। বাজারকে স্বাভাবিক করতে হলে লাগাম কার হাতে আছে, এই প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব এবং কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া বিকল্প নেই।