

প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাংলাদেশের অর্থনীতির দীর্ঘদিনের ভরসা। সাম্প্রতিক সময়ে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির পরিসংখ্যান দেখেও স্বস্তির কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে ব্যাংকিং খাতে একটি বিপরীত বাস্তবতা স্পষ্ট, তারল্য সংকট।
প্রশ্নটি তাই অত্যন্ত যৌক্তিক: রেমিট্যান্স বাড়লে ব্যাংকে অর্থের জোগান বাড়ার কথা, অথচ বাস্তবে কেন তার উল্টো চিত্র?
এই দ্বন্দ্বের উত্তর খুঁজতে গেলে কেবল অঙ্ক নয়, পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতরের কাঠামোগত সমস্যাগুলোর দিকে তাকাতে হয়।
রেমিট্যান্স বৃদ্ধির তথ্য মূলত ডলারে হিসাব করা। কিন্তু এই ডলার কতটা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় স্থায়ীভাবে থেকে যাচ্ছে, সেটাই মূল প্রশ্ন। বাস্তবে দেখা যায়, আসা ডলারের বড় অংশই আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় দ্রুত ব্যবহৃত হয়ে যাচ্ছে।
অর্থাৎ রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেও তা ব্যাংকগুলোর হাতে দীর্ঘমেয়াদি তারল্য হিসেবে থাকছে না।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে একসঙ্গে দুই ধরনের সংকটে, ডলার সংকট ও টাকার সংকট। রেমিট্যান্স আসে ডলারে, কিন্তু ব্যাংকগুলোর দৈনন্দিন কার্যক্রম চলে টাকায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন রিজার্ভ রক্ষার জন্য ডলার কিনে নেয় বা আমদানি বিল মেটাতে ডলার ছাড়ে, তখন তার বিপরীতে টাকার প্রবাহ সংকুচিত হয়।
ফলে ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে ডলার থাকলেও ঋণ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত টাকার তারল্য তৈরি হয় না।
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার বাড়ানোর ফলে ঋণের খরচ বেড়েছে। এতে একদিকে নতুন ঋণ বিতরণ কমছে, অন্যদিকে পুরোনো ঋণ আদায়ে চাপ বাড়ছে। কিন্তু বাস্তবে খেলাপি ঋণ কমার গতি ধীর।
এর ফল হলো- ব্যাংকের অর্থ আটকে থাকছে, ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে না। তারল্য সংকটের এটি একটি নীরব কিন্তু গভীর কারণ।
রাজস্ব ঘাটতি পূরণে সরকার যখন ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি ঋণ নেয়, তখন বেসরকারি খাতে তারল্যের প্রাপ্যতা কমে যায়। ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ ব্যাংকের জন্য নিরাপদ হলেও এটি অর্থনীতির উৎপাদনমুখী খাতে অর্থ প্রবাহ কমিয়ে দেয়।
ফলে রেমিট্যান্সের অর্থ সরাসরি ব্যাংকের ঋণ সক্ষমতা বাড়াতে পারছে না।
ব্যাংকিং খাতের নানা অনিয়ম, দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও খেলাপি ঋণের খবর সাধারণ আমানতকারীর আস্থা ক্ষুণ্ন করেছে। অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি আমানতের বদলে নগদ বা বিকল্প বিনিয়োগে ঝুঁকছেন।
আমানত প্রবৃদ্ধি কমে গেলে রেমিট্যান্স প্রবাহও ব্যাংকিং তারল্যে রূপ নিতে ব্যর্থ হয়।
যদিও বৈধ রেমিট্যান্স বাড়ছে, তবু হুন্ডি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বৈধ ও অবৈধ প্রবাহের এই সহাবস্থান ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে। আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে না এলে রেমিট্যান্সের সম্ভাব্য তারল্য সুবিধা হারিয়ে যায়।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং সংকট মূলত প্রবাহের নয়, ব্যবস্থাপনার। রেমিট্যান্স বাড়া একটি ইতিবাচক সূচক, কিন্তু খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি, অদক্ষ তারল্য ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত দ্বন্দ্ব থাকলে এই অর্থ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।
তারল্য সংকট কাটাতে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রয়োজন-
খেলাপি ঋণ আদায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি
সরকারি ঋণ গ্রহণে ভারসাম্য
ডলার ও টাকার বাজারে সমন্বিত নীতি
ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনর্গঠন
রেমিট্যান্স তখনই অর্থনীতির শক্তিতে পরিণত হবে, যখন ব্যাংকিং ব্যবস্থা তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারবে।
রেমিট্যান্স বাড়া স্বস্তির, কিন্তু সেটিকে তারল্যে রূপান্তর করতে না পারা গভীর সংকেত। এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের ব্যাংকিং সংকট সংখ্যার নয়, কাঠামোর। এই কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ যতই বাড়ুক, তারল্য সংকট থেকে মুক্তি মিলবে না।