

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেশে জরুরি জ্বালানি চাহিদা পূরণে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাজাখস্তান ও ওমান থেকে ১৭ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করবে সরকার।
এসব তেল আমদানির প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য আজ শনিবার (৪ এপ্রিল) ছুটির দিনেও বিকেলে অনলাইনে বৈঠকে বসছে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ও সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
প্রস্তাবিত ১৭ লাখ টন জ্বালানি তেলের মধ্যে ১৬ লাখ টন ডিজেল এবং ১ লাখ টন পেট্রোল রয়েছে।
একসঙ্গে এত বিপুল পরিমাণ তেল আমদানির উদ্যোগ এর আগে কখনও নেয়নি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
এই পরিমাণ ডিজেল দিয়ে দেশের সাড়ে চার মাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। এছাড়া ১ লাখ টন পেট্রোল দিয়ে ৭১ দিনের চাহিদা পূরণ করা যাবে।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, "যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে ১৭ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শনিবার অনুষ্ঠেয় সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে প্রস্তাবগুলো অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হবে।"
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহনের রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। ফলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও জ্বালানি সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার তুলনামূলক বেশি দামে বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের লক্ষ্য নিয়ে কয়েকটি আফ্রিকান দেশ থেকেও পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
আফ্রিকার নয়টি দেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন রয়েছে। এগুলো হলো—আলজিয়ার্স (আলজেরিয়া), কায়রো (মিসর), আদ্দিস আবাবা (ইথিওপিয়া), নাইরোবি (কেনিয়া), ত্রিপোলি (লিবিয়া), পোর্ট লুইস (মরিশাস), রাবাত (মরক্কো), আবুজা (নাইজেরিয়া) এবং প্রিটোরিয়া (দক্ষিণ আফ্রিকা)।
সূত্র জানিয়েছে, পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির বিষয়ে আলোচনা শুরু করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত মাসে এসব মিশনে চিঠি পাঠিয়েছে।
এ মাসের শেষ দিকে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিপিসি এবং আফ্রিকায় বাংলাদেশের মিশনগুলোর অনলাইনে একটি জুম মিটিং করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সূত্রগুলো আরও জানায়, গত মাসে নাইজেরিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার মিয়া মোহাম্মদ মঈনুল কবির আবুজায় দেশটির পেট্রোলিয়াম সম্পদবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী (গ্যাস) একপেরিকপে একপোর সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে বাংলাদেশে পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানির অনুরোধ জানানো হয়।
এদিকে, আলজেরিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. নজমুল হুদা দেশটিতে পেট্রোলিয়াম আমদানি নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। মরক্কোতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সাদিয়া ফাইজুন্নেসাও পেট্রোলিয়াম সরবরাহের নতুন পথ খুঁজছেন।
তবে কমে আসা মজুতের প্রভাব স্থানীয় সরবরাহে পড়তে শুরু করেছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোলপাম্পে পেট্রোল ও অকটেন কিনতে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
তবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গতকাল আবারও বলেছেন, দেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই; জ্বালানি আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার আগামী তিন মাসের জন্য পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি জ্বালানি সাশ্রয়ে নতুন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বাজার বন্ধ করা এবং মন্ত্রী ও সচিবদের ব্যয় ৩০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত রয়েছে।
টাঙ্গাইল শহরের মাহমুদুল হাসান চাঁদ বাজার পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রস্তাবিত ক্রয় পরিকল্পনা
সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকের এজেন্ডা থেকে জানা গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিবিএস ট্রেডিং হাউজ এফজেডসিওর কাছ থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ১০ লাখ টন ইএন ৫৯০-১০ পিপিএম মানের ডিজেল আমদানি করা হবে।
একই কোম্পানির কাছ থেকে ১ লাখ টন গ্যাসোলিন ৯৫ আনলেডেড (পেট্রোল) আমদানি করা হবে।
এছাড়া, ওমানভিত্তিক ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনাল এসপিসির কাছ থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ১ লাখ টন ৫০ পিপিএম সালফার মানের ডিজেল আমদানির প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে তোলা হবে।
পাশাপাশি, কাজাখস্তানের প্রতিষ্ঠান কাজাখ গ্যাস প্রসেসিং প্ল্যান্ট এলএলপির কাছ থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ৫ লাখ টন হাই-স্পিড ডিজেল (এইচএসডি) বা অটোমোটিভ গ্যাস অয়েল (এজিও) আমদানির প্রস্তাবও একই সভায় উপস্থাপন করা হবে।
বর্তমানে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও ওমান জি-টু-জি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানি করে থাকে।
শুক্রবার চট্টগ্রামে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, "মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাসের সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ জ্বালানি যেহেতু ওই অঞ্চল থেকে আসে, তাই সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারকে বিকল্প উৎস থেকে তুলনামূলক বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে।"
তিনি বলেন, "জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কোনো আপস করছে না। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার উচ্চমূল্যে বিকল্প উৎস থেকে তেল আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে।"