

ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে ই-কমার্সকে একসময় ভবিষ্যতের বাজার হিসেবে দেখা হয়েছিল। কম খরচে পণ্য পাওয়া, ঘরে বসে কেনাকাটা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার বাজারে প্রবেশ, সব মিলিয়ে অনলাইন বাণিজ্য ছিল সম্ভাবনার প্রতীক।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই সম্ভাবনার জায়গায় সবচেয়ে বড় যে শব্দটি সামনে এসেছে, তা হলো ‘বিশ্বাস সংকট’। প্রশ্ন হলো- যেখানে প্রযুক্তি এগিয়েছে, লেনদেন বেড়েছে, সেখানেই কেন আস্থার ঘাটতি গভীর হচ্ছে?
অনলাইন বাজারে পণ্য ছোঁয়া যায় না, বিক্রেতাকে দেখা যায় না, লেনদেন হয় ভার্চুয়ালি। ফলে বিশ্বাসই এখানে একমাত্র ভিত্তি। এই বিশ্বাস ভাঙলে পুরো ইকোসিস্টেম নড়বড়ে হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের ই-কমার্সে সেই ভাঙনের অভিজ্ঞতা ভোক্তারা একাধিকবার পেয়েছেন। পণ্য না পাওয়া, দেরিতে ডেলিভারি, নিম্নমানের পণ্য, টাকা ফেরত না পাওয়া।
এই অভিজ্ঞতাগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি কাঠামোগত দুর্বলতার প্রকাশ।
বাংলাদেশের ই-কমার্সের বড় অংশই দীর্ঘদিন ক্যাশ-বার্নিং মডেলের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। অতিরিক্ত ছাড়, আগাম পেমেন্ট ও দ্রুত সম্প্রসারণ, এই তিনের সমন্বয় টেকসই ব্যবসার বদলে ঝুঁকি বাড়িয়েছে। আগাম পেমেন্টের অর্থ ঘুরিয়ে নতুন অর্ডার চালানোর প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রে পনজি-সদৃশ সংকট তৈরি করেছে।
ফলে একবার প্রবাহে ব্যাঘাত ঘটলেই পুরো প্ল্যাটফর্ম ভেঙে পড়েছে।
ই-কমার্স খাত দীর্ঘদিন কার্যকর নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। লাইসেন্সিং, গ্রাহক সুরক্ষা, এসক্রো ব্যবস্থার অনুপস্থিতি এবং দুর্বল নজরদারি অপারেটরদের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণকে উৎসাহিত করেছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন থাকলেও ডিজিটাল লেনদেনের জন্য নির্দিষ্ট প্রয়োগ কাঠামো ছিল সীমিত।
এই নীতিগত শূন্যতা বিশ্বাস সংকটকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
ই-কমার্সের সফলতা কেবল ওয়েবসাইট বা অ্যাপে নয়, নির্ভর করে ডেলিভারি ও রিটার্ন ব্যবস্থার ওপর। বাংলাদেশের লজিস্টিক খাত এখনও খণ্ডিত ও অসম। ফলে সময়মতো পণ্য না পৌঁছানো বা ফেরত প্রক্রিয়ায় জটিলতা ভোক্তার অভিজ্ঞতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বিশ্বাস সংকটের ফলে ভোক্তারা এখন বেশি সতর্ক। আগাম পেমেন্টে অনীহা, ক্যাশ অন ডেলিভারিতে ঝোঁক, পরিচিত ব্র্যান্ড ছাড়া অর্ডার না করা, এই প্রবণতা ই-কমার্সের প্রবৃদ্ধিকে ধীর করছে। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এটি বাড়তি চ্যালেঞ্জ।
ফ্রড ডিটেকশন, ট্র্যাকিং, এসক্রো, প্রযুক্তিগত সমাধান রয়েছে। কিন্তু সেগুলো বাধ্যতামূলক না হওয়ায় ব্যাপকভাবে প্রয়োগ হয়নি। ফলে প্রযুক্তির সক্ষমতা ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে ফাঁক রয়ে গেছে।
ই-কমার্সের ভবিষ্যৎ এখন প্রযুক্তির চেয়ে আস্থার ওপর বেশি নির্ভরশীল। বিশ্বাস ফেরাতে হলে-
এসক্রো ও গ্রাহক সুরক্ষা বাধ্যতামূলক করা
লাইসেন্সিং ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়া
লজিস্টিক মান উন্নয়ন
এ ছাড়া প্ল্যাটফর্মকে ‘বাজার’ নয়, ‘দায়িত্বশীল মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে কাজ করতে হবে।
অনলাইন বাজারে বিশ্বাস সংকট কোনো সাময়িক ধাক্কা নয়; এটি একটি মোড় ঘোরানো পর্যায়। এখান থেকে হয় ই-কমার্স পরিপক্ব হবে, নয়তো স্থায়ী অনাস্থায় আটকে পড়বে। প্রযুক্তি আছে, বাজার আছে, এখন প্রয়োজন নৈতিক ব্যবসা, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও ভোক্তা আস্থার পুনর্গঠন।
ই-কমার্সের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ তাই আর বিস্তৃতি নয়; বিশ্বাস।