

একসময় ডলার সংকট মানেই ছিল আমদানি বন্ধ, এলসি না খোলা, বাজারে পণ্যের টান। সাম্প্রতিক সময়ে দৃশ্যপট কিছুটা বদলেছে। এলসি খোলার সংখ্যা ও পরিমাণ কমেছে, ডলারের দামে চরম অস্থিরতা নেই, তবু নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি আসছে না। চাল, তেল, ডাল, চিনি কিংবা নিত্যব্যবহার্য ভোগ্যপণ্য- দাম যেন এক জায়গায় আটকে আছে। প্রশ্ন উঠছে, ডলার সংকট যদি নিয়ন্ত্রিতই হয়, তবে বাজার কেন আগের মতোই চাপের মধ্যে?
এলসি কমা মানেই দাম কমা নয়
এলসি খোলা কমার অর্থ সব সময় আমদানি ব্যয় কমে যাওয়া নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি চাহিদা সংকোচনের প্রতিফলন। ডলার সংকটের সময় ব্যবসায়ীরা উচ্চ দামে এলসি খুলে পণ্য আমদানি করেছেন। সেই পণ্য এখনো বাজারে রয়েছে এবং ব্যবসায়ীরা আগের ব্যয় মাথায় রেখেই দাম নির্ধারণ করছেন। ফলে নতুন করে এলসি কমলেও পুরোনো উচ্চ ব্যয়ের প্রভাব বাজার থেকে কাটেনি।
ডলারের ‘ল্যাগ ইফেক্ট’
ডলার বাজারে একটি সময়গত ব্যবধান কাজ করে। ডলারের দাম স্থিতিশীল হলেও তার সুফল সঙ্গে সঙ্গে ভোক্তা পর্যায়ে আসে না। উচ্চ দামে আমদানি করা পণ্য বিক্রি শেষ না হওয়া পর্যন্ত দাম কমানোর আগ্রহ থাকে না। এই ‘ল্যাগ ইফেক্ট’ নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি আসার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমদানি ব্যয়ের একমুখী সমন্বয়
বাংলাদেশের বাজারে একটি পরিচিত প্রবণতা আছে, ব্যয় বাড়লে দাম দ্রুত বাড়ে, কিন্তু ব্যয় কমলে দাম কমতে দেরি হয়। পরিবহন, জ্বালানি বা ডলারের দামের প্রভাব প্রথম সুযোগেই পণ্যের দামে যুক্ত হয়। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সেই সমন্বয় উল্টো দিকে হয় না। এতে বাজারে ‘দাম আটকে থাকার’ সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
মজুত ও বাজার কাঠামোর প্রভাব
বাজার কাঠামোও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। আমদানিকারক থেকে পাইকার, পাইকার থেকে খুচরা, প্রতিটি ধাপে মজুত ও মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত। এলসি কমলেও তারা বাজারে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে দাম স্থিতিশীল রাখতে পারে। ফলে ভোক্তা পর্যায়ে দাম কমার চাপ তৈরি হয় না।
ডলারের পাশাপাশি বেড়েছে অন্যান্য ব্যয়
ডলারই একমাত্র ব্যয় নয়। সুদহার বৃদ্ধি, ব্যাংক চার্জ, পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যয় এখনো বেশি। এসব খরচ আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করছেন। ফলে ডলারের দাম কিছুটা স্বস্তিদায়ক হলেও সামগ্রিক ব্যয় কাঠামো বাজারকে নিচের দিকে নামতে দিচ্ছে না।
আয় সংকোচন ও বাধ্যতামূলক চাহিদা
ভোক্তার আয় বাড়েনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে কমেছে। তবু নিত্যপণ্যের চাহিদা কমানোর সুযোগ নেই। এই বাধ্যতামূলক চাহিদার সুযোগে বাজারে দামের ওপর চাপ কমে না। মানুষ কিনছে বলেই দাম কমানোর তাগিদও তৈরি হচ্ছে না।
নীতির ফাঁক ও তদারকির দুর্বলতা
মূল্য নিয়ন্ত্রণে নীতিগত উদ্যোগ থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ দুর্বল। বাজার তদারকি অনিয়মিত, তথ্যভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের অভাব রয়েছে। ফলে এলসি ও ডলার পরিস্থিতির পরিবর্তন বাজারে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
ভোক্তা আস্থার সংকট
বাজারে একটি মনস্তাত্ত্বিক উপাদানও কাজ করছে। ভোক্তা ও ব্যবসায়ী উভয়েই মনে করছেন পরিস্থিতি আবার খারাপ হতে পারে। এই আশঙ্কা থেকে ব্যবসায়ীরা দাম কমাতে অনাগ্রহী, আর ভোক্তারা আগাম কিনে রাখার প্রবণতা দেখাচ্ছেন। এতে বাজারে স্বস্তির জায়গা সংকুচিত হচ্ছে।
সমাধান কোথায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিত্যপণ্যের দামে স্বস্তি আনতে হলে শুধু এলসি বা ডলার পরিস্থিতি দেখলে হবে না। আমদানি ব্যয়ের পূর্ণ হিসাব প্রকাশ, বাজারে মজুত ও সরবরাহ চেইনের স্বচ্ছতা, সুদ ও ব্যাংক চার্জ যৌক্তিককরণ এবং কার্যকর বাজার তদারকি, সবকিছু একসঙ্গে কার্যকর করতে হবে।
শেষ কথা
ডলার সংকটের নতুন চেহারা মূলত একটি কাঠামোগত বাস্তবতার প্রতিফলন। এলসি কমা আর ডলার স্থিতিশীল হওয়া প্রয়োজনীয় শর্ত হলেও যথেষ্ট নয়। বাজারে দামের স্বস্তি আসতে হলে নীতি, বাজার কাঠামো ও আস্থার জায়গায় একযোগে পরিবর্তন আনতে হবে। তা না হলে ডলার সংকট নিয়ন্ত্রণে এলেও নিত্যপণ্যের বাজারে চাপ থেকেই যাবে। নাম বদলাবে, বাস্তবতা নয়।