

বছরের পর বছর ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি দ্রুতবর্ধমান শাখা হলো ক্রিপ্টোকারেন্সি। বিশ্বের অনেক দেশে এটি এখন বিনিয়োগ, পেমেন্ট ও বৈদেশিক লেনদেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু বাংলাদেশে ক্রিপ্টো ইকোসিস্টেম এখনও সীমিত, অস্থির এবং সরকারি নীতির অনিশ্চয়তার আওতায়। দেশের ক্রিপ্টো ব্যবসার বর্তমান চিত্র একটি দ্বন্দ্বপূর্ণ বাস্তবতার পরিচায়ক- যেখানে প্রযুক্তি আছে, আগ্রহ আছে, কিন্তু রেগুলেটরি কাঠামো নেই।
বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে, ক্রিপ্টো লেনদেন বৈধ নয়। কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্রিপ্টো সংক্রান্ত লেনদেন পরিচালনা করতে পারবে না। ফলে, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও স্থানীয় উদ্যোক্তা উভয়ের জন্যই আইনি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ফলে, বিদেশি বিনিয়োগ আসতে চাইলেও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেল বন্ধ। স্থানীয় উদ্যোক্তারা তাদের প্রজেক্ট স্কেল করতে পারছেন না, বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমাতে পারছেন না। এই সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের ক্রিপ্টো উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বাইরে রাখছে।
বিশ্বব্যাপী ক্রিপ্টো বিনিয়োগ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশ এই প্রবাহ থেকে বঞ্চিত।
বিদেশি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও ফিনটেক ইনভেস্টররা মূলত আইনি নিশ্চিততা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং রেগুলেটরি কাঠামোর ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশে যখন এসব নেই, তখন-
প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন সীমিত হচ্ছে: নতুন ব্লকচেইন স্টার্টআপ বা DeFi প্ল্যাটফর্মের উদ্ভাবন থমকে যাচ্ছে।
বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহ বন্ধ: আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা অন্য দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন যেখানে আইনি কাঠামো সুনিশ্চিত।
উদ্যোক্তাদের আস্থা কমছে: দেশীয় উদ্যোক্তারা বিদেশি মার্কেটের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারছেন না।
ফলে, দেশের সম্ভাব্য ‘ক্রিপ্টো হাব’ হওয়ার সুযোগ হারাচ্ছে।
ক্রিপ্টোতে বৈদেশিক বিনিয়োগের একটি প্রধান সুবিধা হলো দেশে নতুন প্রযুক্তি ও দক্ষতার আগমন, যা ফিনটেক ইকোসিস্টেমকে শক্তিশালী করতে পারে।
তবে, আইনি শূন্যতা ও রেগুলেটরি দ্বন্দ্ব থাকায়-
মুদ্রা ও অর্থনীতিতে ঝুঁকি: বিনিয়োগকারীরা হঠাৎ চলে গেলে স্থানীয় বাজারে লিকুইডিটি সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
ভোগ্যপণ্য ও ব্যাংকিং খাতে প্রভাব: ক্রিপ্টো লেনদেন নিয়ন্ত্রণে না থাকায় অর্থের বৈদেশিক ব্যবস্থাপনা জটিল হয়।
কন্ট্রোল হারানোর সম্ভাবনা: হ্যাক, ফ্রড বা মানি লন্ডারিং এর মতো সমস্যা বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশে সরকার একটি দ্বৈত রণনীতি অবলম্বন করছে- একদিকে প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও ফিনটেক উন্নয়নের জন্য আগ্রহ দেখানো, অন্যদিকে ক্রিপ্টো লেনদেন কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ। এই দ্বন্দ্বই উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীর মধ্যে সন্দেহ ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে প্রযুক্তির আগ্রহ থাকলেও বাজার স্থিতিশীলভাবে বিকাশ করতে পারছে না। অর্থাৎ আইনি স্বচ্ছতার অভাবে সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ব্লকচেইন ও ক্রিপ্টো প্রযুক্তি শুধুমাত্র বিনিয়োগের মাধ্যম নয়। এটি বৈদেশিক রেমিট্যান্স সহজীকরণ, ট্রেড ফাইন্যান্স স্বচ্ছতা, এবং ভোক্তা লেনদেনের নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যদি সঠিক নীতিমালা ও রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা হয়, বাংলাদেশের ফিনটেক খাত আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে পারে।
বিশ্বাসযোগ্য রেগুলেটরি কাঠামো ছাড়া ক্রিপ্টো উদ্যোগ বিকশিত হতে পারবে না। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রয়োজন-
বৈধ ও সীমিত রূপে ক্রিপ্টো ব্যবসার অনুমোদন,
আস্থা রক্ষাকারী নীতি,
ফ্রড ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে শক্তিশালী ব্যবস্থা,
বিদেশি বিনিয়োগকে আকর্ষণ করার জন্য কর ও লভ্যাংশ নীতি সহজীকরণ।
এগুলো ছাড়া প্রযুক্তি থাকলেও বাজারে আস্থা হবে না, আর বৈদেশিক বিনিয়োগ আসবে না।
ক্রিপ্টো ইকোসিস্টেমে বাংলাদেশ সম্ভাবনার দেশে পরিণত হতে পারে, কিন্তু রেগুলেটরি দ্বন্দ্ব তা বাধাগ্রস্ত করছে। প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ, তিনটি হাত মিলিয়ে চলতে হবে। নইলে ই-অর্থনীতির এই সম্ভাবনা কেবল স্বপ্নেই থেকে যাবে।
বাংলাদেশে ক্রিপ্টো ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আইনি স্থিতিশীলতা ও বাজার আস্থার পুনর্গঠনের ওপর, নইলে ডলারের মতো স্থিতিশীলতার সুবিধা থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় উদ্ভাবন থমকে থাকবে।