

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে Foreign Direct Investment (FDI) ধারাবাহিকভাবে চাপের মধ্যে। ২০২৪ সালে এফডিআই কমে প্রায় ১৩% হ্রাস পেয়ে প্রায় ১.২৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। এটি টানা কয়েক বছরের পতনের ধারাবাহিকতা, এবং কোভিড-পরবর্তী রিকভারি টেকসই হয়নি। তুলনায় বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে বিনিয়োগ পুরোপুরি থেমে যায়নি , বরং কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে। ফলে প্রশ্ন: সমস্যা কি গ্লোবাল, নাকি বাংলাদেশ-নির্দিষ্ট?
বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দুই জিনিস দেখে: পলিসি স্ট্যাবিলিটি ও অপারেশনাল সুবিধা। বাংলাদেশে এই দুই ক্ষেত্রেই ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে।
নীতিগত অনিশ্চয়তা (policy uncertainty) এবং বাস্তব জটিলতা (structural bottlenecks), এই দুইয়ের সমন্বয়েই সংকট তৈরি
নীতি পরিমার্জনের ধারাবাহিকতার অভাব
দীর্ঘমেয়াদি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি থাকলেও বাস্তবায়নে ঘন ঘন পরিবর্তন
“ঘোষণা এবং সেটার বাস্তবায়নের মধ্যে” গ্যাপ
প্রশাসনিক অস্থিরতা ও সংস্কার সংকট
২০২৫ সালের, 2025 National Board of Revenue strike-এর মতো ঘটনা সরাসরি ব্যবসা ও বাণিজ্যে প্রভাব ফেলে
হঠাৎ নীতিগত পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকির ধারণা বাড়ায়
ম্যাক্রো-ইকোনমিক চাপ
মুদ্রার অবমূল্যায়ন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রা সংকট
বিনিয়োগের রিটার্ন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে
রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি
সরকার পরিবর্তন বা নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা
দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আস্থা কমে যায়
ডেমোক্রেটিক জটিলতা
লাইসেন্স, অনুমোদন, ট্যাক্স, সবকিছুতেই দীর্ঘসূত্রতা
“ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ” বাস্তবে দুর্বল
অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা
বিদ্যুৎ সংকট, গ্যাস ঘাটতি
বন্দর জট ও লজিস্টিক ব্যয় বেশি
কর কাঠামো ও নীতি অসামঞ্জস্য
উচ্চ কর চাপ
ট্যাক্স-টু-জিডিপি অনুপাত কম হলেও সংগ্রহ পদ্ধতি অদক্ষ
প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা
বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব
বিনিয়োগ-পরবর্তী সাপোর্ট (aftercare) দুর্বল
বিনিয়োগের পরিমাণে বিশাল ব্যবধান
ভিয়েতনাম: প্রায় ৩৬-৩৯ বিলিয়ন ডলার
ভারত: ২৫-২৮ বিলিয়ন ডলার
বাংলাদেশ: কয়েক বিলিয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ
ভিয়েতনামের সাফল্যের কারণ
স্থিতিশীল নীতিমালা ও দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া
ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (FTA)-এর বিস্তৃত নেটওয়ার্ক
গ্লোবাল ভ্যালু চেইনে শক্ত সংযুক্তি (ইলেকট্রনিকস, টেক)
ভারতের শক্তি
বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার
প্রোডাকশন-লিংকড ইনসেনটিভ (PLI)
স্টার্টআপ ও টেক ইকোসিস্টেম
গ্লোবাল র্যাঙ্কিংয়ে অবস্থান উন্নতি
বাংলাদেশের সীমাবদ্ধতা
খাত বৈচিত্র্যের অভাব
গার্মেন্টস-নির্ভর ইমেজ
বড় স্কেলের বিনিয়োগ টানার মতো ইকোসিস্টেম দুর্বল
বিশ্বব্যাপী এফডিআই ২০২৪ সালে কমেছে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বড় কারণ
ট্যারিফ, যুদ্ধ, সাপ্লাই চেইন বিভাজন বিনিয়োগ কমাচ্ছে
তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (যেমন ভিয়েতনাম) এই পরিস্থিতিতেও বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে
অর্থাৎ: গ্লোবাল সংকট থাকলেও “লোকেশন কম্পিটিটিভনেস” বড় ফ্যাক্টর
শিল্পায়ন ধীর হয়ে যায়
প্রযুক্তি ট্রান্সফার কমে
কর্মসংস্থান সৃষ্টি সীমিত হয়
এক্সপোর্ট ডাইভারসিফিকেশন বাধাগ্রস্ত
মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য ঝুঁকির মুখে
২০২৫ সালে কিছু সময় এফডিআই প্রবাহে বৃদ্ধি দেখা গেছে
পুনঃবিনিয়োগ (reinvested earnings) বাড়ছে
কিছু বিদেশি কোম্পানি দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি ধরে রাখছে
অর্থাৎ আস্থা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, কিন্তু দুর্বল হয়েছে
বৃহৎ শ্রমবাজার: কম খরচে শ্রম এখনও বড় আকর্ষণ
ভৌগোলিক অবস্থান: দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল
উদীয়মান খাত: আইটি, ফার্মা, ইলেকট্রনিকস, এগ্রি-প্রসেসিং
বাজার সম্প্রসারণ: অভ্যন্তরীণ ভোক্তা বাজার ধীরে ধীরে বাড়ছে
বিনিয়োগ অন্য দেশে সরে যাওয়া- বিশেষ করে ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া
গার্মেন্টস নির্ভরতা আরও বেড়ে যাওয়া- অর্থনীতির ঝুঁকি বৃদ্ধি
উচ্চ বেকারত্ব ও কম শিল্পায়ন– তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য চ্যালেঞ্জ
বৈদেশিক মুদ্রা সংকট দীর্ঘস্থায়ী হওয়া
* নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা- দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নীতি স্থিতিশীল করা
* “Ease of Doing Business” বাস্তবায়ন- অনুমোদন প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশন
* অবকাঠামো উন্নয়ন- বিদ্যুৎ, বন্দর, লজিস্টিকস
* খাতভিত্তিক ইনসেনটিভ- গার্মেন্টস ছাড়াও নতুন খাতকে প্রাধান্য
* বিনিয়োগ-পরবর্তী সাপোর্ট- বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের ধরে রাখা
* আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং- “Bangladesh as an Investment Destination” তৈরি
বাংলাদেশের এফডিআই সংকট একমাত্র “আস্থার সংকট” নয়, এটি একটি কাঠামোগত, নীতিগত এবং প্রতিযোগিতামূলক সমস্যার সম্মিলিত ফল
গ্লোবাল চ্যালেঞ্জ থাকলেও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়াই মূল ইস্যু
ইতিবাচক দিক হলো- সম্ভাবনা এখনো রয়েছে
কিন্তু দ্রুত সংস্কার না হলে 'বিফল সুযোগ' (missed opportunity) বাস্তবতায় পরিণত হতে পারে
বাংলাদেশের সামনে পথ দুটি-
একটি হলো বর্তমান ধারা ধরে রেখে ধীরে চলা,
অন্যটি হলো কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে নিজেকে একটি আঞ্চলিক বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।
কোন পথটি নেওয়া হবে, সেটিই আগামী দশকের অর্থনৈতিক বাস্তবতা নির্ধারণ করবে।