

দেশের শিল্প ও বাণিজ্যের মেরুদণ্ড হিসেবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় উৎপাদন, গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখা, সবখানেই এসএমইর অবদান অনস্বীকার্য। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা স্পষ্ট: ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এসএমই ঋণের চাহিদা কমছে।
প্রশ্ন উঠছে- ঋণ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও উদ্যোক্তারা কেন পিছিয়ে যাচ্ছেন?
এসএমই ঋণে আগ্রহ কমার প্রথম ও সবচেয়ে দৃশ্যমান কারণ সুদহার বৃদ্ধি। নীতিগতভাবে বাজারভিত্তিক সুদহার চালু হওয়ায় ঋণের খরচ বেড়েছে, কিন্তু এসএমই খাতের পণ্য বা সেবার দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি।
ফলে উদ্যোক্তার সামনে প্রশ্ন দাঁড়ায়- ঋণ নিয়ে উৎপাদন বাড়ালে আদৌ লাভ থাকবে কি না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাঁচামাল, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি। উচ্চ ব্যয়ের বাস্তবতায় ঋণ কেবল ঝুঁকির মাত্রা বাড়াচ্ছে, এই ধারণা উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রবল হচ্ছে।
এসএমই উদ্যোক্তারা শুধু উৎপাদন নয়, বিক্রির নিশ্চয়তাও চান। কিন্তু বর্তমানে বাজারে ভোগব্যয় সংকুচিত। গ্রামীণ ও শহুরে উভয় অর্থনীতিতেই চাহিদা কমেছে। ফলে অনেক উদ্যোক্তা মনে করছেন, ঋণ নিয়ে উৎপাদন বাড়ালে পণ্য বিক্রি হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
এই অনিশ্চয়তা উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি-বিমুখ করে তুলছে। তারা নতুন বিনিয়োগের বদলে টিকে থাকার কৌশলে মনোযোগ দিচ্ছেন।
এসএমই ঋণ তাত্ত্বিকভাবে সহজ বললেও বাস্তবে প্রক্রিয়াগত জটিলতা উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে। জামানত, কাগজপত্র, দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক চাপ, এসব বিষয় উদ্যোক্তার অভিজ্ঞতাকে নেতিবাচক করে তুলছে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, ঋণ পুনঃতফসিল বা সংকটকালে ব্যাংকের সহযোগিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা। অনেক উদ্যোক্তা মনে করেন, একবার সমস্যায় পড়লে ব্যাংক অংশীদার নয়, বরং চাপ সৃষ্টিকারী হয়ে ওঠে।
সরকারি ঘোষণায় এসএমই খাতে প্রণোদনা, রিফাইন্যান্স স্কিম ও স্বল্পসুদে ঋণের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন সীমিত। অনেক উদ্যোক্তা এসব সুবিধা সম্পর্কে জানেন না, আবার জানলেও তা পাওয়ার প্রক্রিয়া জটিল।
ফলে নীতিগত সহায়তা বাস্তবে উদ্যোক্তার আস্থায় রূপ নিতে পারছে না।
ব্যাংক ঋণের ঝামেলা এড়াতে অনেক এসএমই উদ্যোক্তা অনানুষ্ঠানিক উৎসে ঝুঁকছেন- পারিবারিক ঋণ, স্থানীয় মহাজন বা ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বে। যদিও এসব উৎসের সুদ ও ঝুঁকি বেশি, তবু দ্রুততা ও নমনীয়তা উদ্যোক্তাদের আকর্ষণ করছে।
এটি দীর্ঘমেয়াদে এসএমই খাতের জন্য একটি নীরব ঝুঁকি তৈরি করছে।
ডিজিটাল লেনদেন ও ফিনটেকভিত্তিক ঋণ এসএমই অর্থায়নের নতুন দিগন্ত খুলতে পারত। কিন্তু তথ্য ঘাটতি, ক্রেডিট স্কোরিং দুর্বলতা এবং নীতিগত স্পষ্টতার অভাবে এই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগছে না।
এসএমই ঋণে আগ্রহ ফেরাতে হলে কেবল তহবিল বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সুদহার সহনীয় করা, ব্যাংকিং প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বাজারে চাহিদা পুনরুদ্ধার। ব্যাংককে উদ্যোক্তার অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে, কেবল ঋণদাতা হিসেবে নয়।
একই সঙ্গে এসএমই পণ্যের জন্য বাজার সংযোগ, রপ্তানি সহায়তা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে সহায়তা জরুরি।
এসএমই ঋণে আগ্রহ কমা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি অর্থনীতির গভীর অনিশ্চয়তার প্রতিফলন। উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়ছেন কারণ ঝুঁকি বেড়েছে, আস্থা কমেছে। এই আস্থার সংকট কাটাতে না পারলে এসএমই খাতের স্থবিরতা সামগ্রিক অর্থনীতির গতিকে আরও ধীর করে দেবে।