নিত্যপণ্যের বাজারে অঘোষিত সিন্ডিকেট আইন আছে, নিয়ন্ত্রণ নেই কেন?

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে দাম বাড়া এখন আর মৌসুমি ঘটনা নয়; বরং এটি হয়ে উঠেছে একধরনের নিয়মিত চাপ।
নিত্যপণ্যের বাজারে অঘোষিত সিন্ডিকেট
আইন আছে, নিয়ন্ত্রণ নেই কেন?
প্রকাশিত

চাল, ডাল, তেল, চিনি কিংবা পেঁয়াজ, পণ্যভেদে কারণ আলাদা দেখানো হলেও ভোক্তার অভিজ্ঞতায় একটি বিষয়ই বারবার ফিরে আসে: বাজারে যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি দাম নিয়ন্ত্রণ করছে।

প্রশ্ন হলো, যখন প্রতিযোগিতা আইন আছে, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন আছে, তদারকি সংস্থা আছে, তখনও কেন নিত্যপণ্যের বাজারে অঘোষিত সিন্ডিকেট ভাঙা যাচ্ছে না?

সিন্ডিকেট কীভাবে কাজ করে: দৃশ্যমান নয়, প্রভাব গভীর

অঘোষিত সিন্ডিকেট মানে লিখিত কোনো চুক্তি নয়, কোনো প্রকাশ্য সংগঠনও নয়। এটি মূলত আমদানিকারক, পাইকার, বড় মজুতদার এবং ক্ষেত্রবিশেষে পরিবহন ও খুচরা পর্যায়ের একটি স্বার্থভিত্তিক বোঝাপড়া। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও কৃত্রিম সংকট তৈরি, একই সময়ে একই হারে দাম বাড়ানো, কিংবা সরকারি ঘোষণা উপেক্ষা করে বাজারে ভিন্ন মূল্য বাস্তবায়ন- এসবই সিন্ডিকেটের পরিচিত কৌশল।

বিশেষ করে আমদানি-নির্ভর পণ্যে সিন্ডিকেটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। সীমিতসংখ্যক বড় আমদানিকারক বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করলে প্রতিযোগিতা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যায় না।

আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগে দুর্বলতা

বাংলাদেশে প্রতিযোগিতা কমিশন আইনগতভাবে বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকলেও বাস্তবে তাদের কার্যকর হস্তক্ষেপ খুব সীমিত। একদিকে তথ্য সংগ্রহের ঘাটতি, অন্যদিকে দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়া, সব মিলিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান চালালেও তা মূলত খুচরা পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে, যেখানে মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে।

আইনের আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো প্রমাণের জটিলতা। অঘোষিত সিন্ডিকেটের ক্ষেত্রে লিখিত প্রমাণ পাওয়া কঠিন, আর বাজারে “সমন্বিত মূল্য আচরণ” প্রমাণ করা সময়সাপেক্ষ ও কারিগরি জ্ঞানের দাবি রাখে।

প্রশাসনিক তদারকি: প্রতিক্রিয়াশীল, প্রতিরোধমূলক নয়

বাজার তদারকি অনেক সময়ই উৎসব, রমজান বা সংকটের মুহূর্তে সক্রিয় হয়। কিন্তু সিন্ডিকেট ভাঙতে প্রয়োজন ধারাবাহিক নজরদারি, ডাটা বিশ্লেষণ এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা। যখন দাম বেড়ে যায়, তখন অভিযান চালানো হয়; কিন্তু কেন দাম বাড়ল, কারা লাভবান হলো- সেই প্রশ্নের কাঠামোগত জবাব খুব কমই খোঁজা হয়।

এ ছাড়া একাধিক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও বড় সমস্যা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিদপ্তর এবং কাস্টমস, সবার কাজ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হলেও কার্যকর সমন্বয় নেই।

ভোক্তা কেন সবচেয়ে দুর্বল পক্ষ

ভোক্তার হাতে তথ্য নেই, দরকষাকষির ক্ষমতা নেই, বিকল্পও সীমিত। ফলে বাজারে দাম বাড়লে তার প্রতিক্রিয়া সামাজিক অসন্তোষে সীমাবদ্ধ থাকে। সংগঠিত ভোক্তা আন্দোলন দুর্বল হওয়ায় বাজারের ওপর চাপ তৈরি হয় না। সিন্ডিকেট জানে, ভোক্তা ক্ষুব্ধ হলেও দীর্ঘমেয়াদে তারা বিকল্পহীন।

সমাধানের পথ: আইন নয়, প্রয়োগই মূল চ্যালেঞ্জ

নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙতে নতুন আইন নয়, প্রয়োজন বিদ্যমান আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ। বড় আমদানিকারক ও পাইকার পর্যায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে- কে কত আমদানি করছে, কত মজুত আছে, কত দামে ছাড়ছে- এই তথ্য নিয়মিত প্রকাশ জরুরি। পাশাপাশি প্রতিযোগিতা কমিশনকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে তারা দ্রুত তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা। বাজার যদি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে কাগুজে আইন দিয়ে সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়।

শেষ কথা

নিত্যপণ্যের বাজারে অঘোষিত সিন্ডিকেট কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি আস্থার সংকটও তৈরি করে। যখন ভোক্তা বিশ্বাস হারায় যে বাজার ন্যায্যভাবে চলছে, তখন পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর প্রশ্ন উঠে। আইন আছে, কাঠামো আছে- এখন প্রয়োজন কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, না হলে সিন্ডিকেট অদৃশ্য থেকেও বাজারের দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রক হয়েই থাকবে।

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com